দীর্ঘদিন যাবৎ তাঁতের কাপড়ের বাজারে মন্দা ভাব বিরাজ করায়, তাঁত শিল্পের অস্তিত্ব বর্তমানে হুমকির মুখে
১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০৯:৫৯ অপরাহ্ন


  

  • বেলকুচি/ অর্থনীতি:

    দীর্ঘদিন যাবৎ তাঁতের কাপড়ের বাজারে মন্দা ভাব বিরাজ করায়, তাঁত শিল্পের অস্তিত্ব বর্তমানে হুমকির মুখে
    ১১ মার্চ, ২০১৮ ০৬:২০ অপরাহ্ন প্রকাশিত

    জহুরুল ইসলামঃ দেশের অন্যতম তাঁত শিল্প সমৃদ্ধ এলাকা হিসেবে পরিচিত সিরাজগঞ্জ জেলার বেলকুচি, এনায়েতপুর, শাহজাদপুর, উল্লাপাড়া, কামারখন্দ, কাজিপুর এবং জেলা সদরের কিছু এলাকায় তাঁতীদের মাঝে বর্তমানে দারুন হতাশা বিরাজ করছে। একদিকে তাঁত শিল্পের উৎপাদন কাজের প্রয়োজনীয় কাচামাল সূতা, রং এবং রাসায়নিক দ্রব্যের অস্বাভাবিক মুল্য বৃদ্ধি এবং সেই সাথে দীর্ঘদিন যাবৎ তাঁতের কাপড়ের বাজারে দারুন মন্দাভাব বিরাজ করায় এই জেলার তাঁত শিল্পের অস্তিত্ব বর্তমানে হুমকির সম্মুখীন। ইতিমধ্যেই এই এলাকার প্রায় অর্ধেক তাঁত বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে তাঁত শিল্পের সাথে জড়িত হাজার হাজার তাঁত শ্রমিক এবং মালিক বর্তমানে বেকার হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে। এই অবস্থা আরও চলতে থাকলে অচিরেই বর্তমানে চালু তাঁতগুলোও বন্ধ হয়ে এক ভয়াবহ অবস্থা সৃষ্টি হওয়ার আশংকা রয়েছে। এই জেলায় এ পর্যন্ত নির্ভরযোগ্য কোন তাঁত শুমারী না হওয়ায় নির্ভূলভাবে প্রকৃত তাঁত সংখ্যা না জানা গেলেও মিডিয়া এবং বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য মোতাবেক সিরাজগঞ্জ জেলায় পাওয়ারলুম, চিত্তরঞ্জন এবং পীটলুম মিলে প্রায় দেড় লক্ষ তাঁত রয়েছে। এই তাঁতের সাথে এখানকার উৎপাদিত শাড়ী, লুঙ্গী, ধুতি, থ্রি-পিচ এবং গামছা অনেক উন্নত মানের এবং সারা দেশে বিপুল ভাবে সমাদৃত। এখানকার তাঁতের শাড়ী ও লুঙ্গী বিদেশে বেসরকারী উদ্যোগে রপ্তানী হয় বলে তাঁতীরা জানান। সরকারী তাঁতজাত সামগ্রী দেশের রপ্তানী পন্যের তালিকায় অন্তর্ভূক্ত হতে পারে বলে তাঁত ফ্যাক্টরীর মালিকরা দাবী করেন। প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ ভাবে এই এলাকার আর্থসামাজিক অবস্থা বিশেষভাবে তাঁত শিল্পের উপর নির্ভরশীল। তাঁতের কাপড়ের বাজার ভাল থাকলে সাধারণ মানুষের আর্থিক অবস্থা ভাল থাকে, আর বাজারে মন্দাভাব দেখা দিলে মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থা ও খারাপ হয়ে যায়। বর্তমানে যেমনটি হয়েছে। এই জেলার তাঁতীদের কাপড় বেচাকেনার প্রধান হাটগুলো হচ্ছে বেলকুচির সোহাগপুর হাট, চৌহালীর এনায়েতপুর হাট, শাহজাদপুর হাট, পার্শ্ববর্তী টাংগাইল জেলার করটিয়া হাট, জোকারচর, সিরাজগঞ্জ সদরের নিউমার্কেট টার্মিনাল হাট এবং পাইকোশা হাট। এইসব হাটের মধ্যে সম্প্রতি সোহাগপুর, শাহজাদপুর এবং এনায়েতপুর হাট ঘুরে দেখা গেছে, তাঁতীরা কাপড় বিক্রীর জন্য তাঁতবস্ত্র সাজিয়ে বসে আছে কিন্তু হাটে বেপারী ও পাইকারদের আগমন তেমন নেই। ক্রেতার চেয়ে বিক্রেতাই বেশী। অথচ ২/১ বছর আগেও এসময়ে এনায়েতপুর, সোহাগপুর এবং শাহজাদপুর হাটে কাপড়ের বেপারী এবং পাইকার ক্রেতাদের পদচারনায় মুখরিত হয়ে থাকতো। এসব হাট থেকে নিয়মিত ভাবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তাঁতের শাড়ী, লুঙ্গী, ধুতী, থ্রি-পিচ, গামছা সহ বিপুল পরিমাণ তাঁত বস্ত্র সরবরাহ করা হতো। বর্তমানে আর সে অবস্থা নেই। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে এই হাটগুলোতে আগত কাপড়ের ক্রেতা বিক্রেতাদের সাথে আলাপ করে জানা যায়, শুধু এই এলাকার হাটগুলোরই অবস্থা এরূপ নয় দেশের অন্যান্য ঐতিহ্যবাহী কাপড়ের হাট যেমন- বাবুর হাট, গাউছিয়া হাট, পাবনার আতাইকুলা হাট, কুষ্টিয়ার কুমারখালী হাটসহ অন্যান্য ছোট বড় সকল কাপড়ের হাটে বেচা কেনায় মন্দাভাব বিরাজ করছে। তাঁত শিল্পের বর্তমান করুন পরিস্থিতি নিয়ে এই অঞ্চলের নেতৃস্থানীয় তাঁত ফ্যাক্টরীর মালিকদের মধ্যে কয়েকজন বেলকুচির জামান টেক্সটাইলের মালিক আলহাজ এম.এ.বাকী, রায় প্রোডাক্ট এর জ্যোতি শাড়ীর মালিক বৈদ্যনাথ রায়, ফাইম টেক্সটাইলের মালিক গোলাম কিবরিয়া বাবু সরকার, সুবর্ণসারার হাজী বদিউজ্জামান, তামাই গ্রামের আবু হাজী, জিধুরীর আনিছুর রহমান, চালা গ্রামের আমিরুল ইসলাম সহ তাঁত ব্যবসায়ীরা জানান, সূতা, রং, কেমিক্যালসহ তাঁত বস্ত্র উৎপাদনের সকল উপকরণের মূল্য অস্বাভাবিক ভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় উৎপাদন ব্যয় যে হারে বৃদ্ধি পেয়েছে সে অনুপাতে উৎপাদিত কাপড়ের মুল্য বৃদ্ধি পায়নি। তার উপর প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে অবৈধ পথ কম মূল্যের নি¤œমানের কাপড় এসে বাজার দখল করায় দেশে উৎপাদিত উন্নত মানের কাপড়ের বাজারে মন্দা দেখা দিয়েছে। ব্যবসায়ীরা দুঃখ করে বলেন, এ ব্যাপারে সরকারের যথাযথ কর্তৃপক্ষের কোনরূপ নজরদারী নেই। তাঁত বোর্ড নামে যে সংস্থাটির এ ব্যাপারে ভূমিকা রাখার কথা তার কোনরূপ কর্মকান্ড নেই বললেই চলে। এই অবস্থায় এলাকার ক্ষুদ্র এবং প্রান্তিক তাঁতীরা ইতিমধ্যেই তাদের চলতি মূলধন হাড়িয়ে তাঁদের তাঁত বন্দ হয়ে বেকার হয়ে গেছে। অন্যদিকে মাঝারী এবং বড় ফ্যাক্টরী যাদের কারখানায় চিত্তরঞ্জন তাঁত এবং পাওয়ারলুমে কাপড় উৎপাদিত হয়, তাদের অবস্থাও এখন ভয়াবহ। স্থানীয় কয়েকটি বেসরকারী ব্যাংক যেমন- ঢাকা ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, মিউচুয়াল ট্রাষ্ট ব্যাংক, বেসিক ব্যাংক এ খোজ নিয়ে জানা গেছে এই সব ব্যাংক থেকে এই এলাকার ফ্যাক্টরী মালিকগণ তাদের কারখানার চলতি মূলধন হিসেবে মোটা অংকের টাকা ঋণ নিয়ে কারখানা পরিচালনা করতেছিল। দীর্ঘদিন যাবৎ কাপড়ের বাজারে মন্দাভাব বিরাজ করায় উৎপাদিত কাপড় বিক্রী করতে না পারায় গুদাম ভর্তি কাপড় থাকলেও তাঁত শ্রমিকদের মুজুরী এবং সূতা রং ক্রয় করার মত টাকা মহাজনের হাতে না থাকায় তাঁত চালু রাখা তাদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। একদিকে চালু তাঁত বন্ধ হয়ে যাচ্ছে অন্যদিকে ব্যাংক ঋণের টাকা কয়েকগুণ বৃদ্ধি পাওয়ায় তা পরিশোধ করা তাদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। বর্তমানে ব্যাংকগুলোর ঋণ গ্রহিতাদের প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ ইতিমধ্যেই ঋণ খেলাপী হয়ে গেছে। কর্তৃপক্ষের চাপে ব্যাংকগুলোর পক্ষ থেকে মামলা দায়ের করায় তাঁত ফ্যাক্টরী বন্ধ করে এইসব তাঁত মালিক বাড়ি থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। দেশের প্রাচীন শিল্প হিসেবে তাঁত শিল্প দেশের মাটি ও মানুষের সাথে নিবিড় ভাবে মিশে আছে। বংশানুক্রমে চলে আসে তাঁত শিল্পের ধারক ও বাহক অনেক তাঁতী বর্তমান অবস্থায় এ পেশা ত্যাগ করে অন্য পেশায় জড়িত হওয়ার চিন্তা ভাবনা করলেও বাস্তবতার নিরিখে তা সম্ভব হচ্ছেনা। কারণ তাঁতীরা তাঁতের কাজ ছাড়া অন্য কোন কাজে পারদর্শী নয়। তাই এই সম্প্রদায় এখন দারুন ভাবে হতাশাগ্রস্থ। বিষয়টি নিয়ে আলোচনায় সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসক কামরুন্নাহার সিদ্দিকা এবং বেলকুচি উপজেলা নির্বাহী অফিসার ওলিউজ্জামান বলেন সিরাজগঞ্জের আর্থ সামাজিক অবস্থার মূলে যেহেতু এই তাঁত শিল্প সুতরাং, আমরা বিষয়টি গুরুত্বের সাথেই বিবেচনা করি। “তাঁত শিল্প” কে আমরা এই জেলার ব্রাান্ডিং প্রস্তাব করেছি। তারা আরও জানান খুব শীঘ্রই এই জেলার প্রকৃত তাঁত সংখ্যা নিরূপনের জন্য তাঁত শুমারী করা হবে। দেশের তাঁত বস্ত্রের বাজার চাঙ্গা সহ এই শিল্পের অস্তিত্ব রক্ষায় বর্তমান জনকল্যানমুখী সরকার অবিলম্বে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবেন বলে এই অঞ্চলের তাঁতীরা আন্তরিক ভাবে বিশ্বাস করে।
    স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বেলকুচি ১১ মার্চ, ২০১৮ ০৬:২০ অপরাহ্ন প্রকাশিত হয়েছে এবং 346 বার দেখা হয়েছে।
    পাঠকের ফেসবুক মন্তব্যঃ
    Expo
    Slide background EduTech EduTech EduTech EduTech EduTech EduTech
    Slide background SaleTech SaleTech SaleTech SaleTech SaleTech EduTech
    বেলকুচি অন্যান্য খবরসমুহ
    সর্বশেষ আপডেট
    নিউজ আর্কাইভ
    ফেসবুকে সিরাজগঞ্জ কণ্ঠঃ
    বিজ্ঞাপন
    সিরাজগঞ্জ কণ্ঠঃ ফোকাস
    • সর্বাধিক পঠিত
    • সর্বশেষ প্রকাশিত
    বিজ্ঞাপন

    ভিজিটর সংখ্যা
    6934473
    ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০৯:৫৯ অপরাহ্ন