দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশে সিরাজগঞ্জের তাঁত শিল্প
১৮ জুলাই, ২০১৮ ০৪:৩৭ অপরাহ্ন


  

  • সিরাজগঞ্জ/ ব্যাবসা বানিজ্য:

    দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশে সিরাজগঞ্জের তাঁত শিল্প
    ০৯ জুন, ২০১৮ ০৩:৫০ অপরাহ্ন প্রকাশিত

    নিজস্ব প্রতিবেদকঃ দীর্ঘ মন্দার পর ঘুরে দাড়াতে শুরু করেছে সিরাজগঞ্জের তাঁতি শিল্প।  কদিন আগেও এ শিল্পে ছিল মন্দাভাব। বেকার হয়ে পড়েছিলেন এ শিল্পসংশ্লিষ্টরা। তবে নিত্য নতুন ডিজাইন আর আর্ন্তজাতিক মানসম্পন্ন কাপড় তৈরি লাভ এনে দিয়েছে তাদের। এখানকার কাপড় এখন রপ্তানি হচ্ছে ভারত, যুক্তরাজ্য, আমেরিকাসহ নানা দেশে।


    এখন অগ্রিম টাকা দিয়েও চাহিদামত কাপড় পাচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা। আসন্ন পবিত্র ঈদ-উল-ফিতর এ চাহিদা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। কর্মমূখর হয়ে উঠেছে  জেলার তাঁতপ্রধান এলাকাগুলো ।


    সিরাজগঞ্জের প্রতিটি এলাকায় এখন দিনরাত তাঁতের খট খট শব্দ। এখানকার এনায়েতপুর, শাহজাদপুর, বেলকুচি, চৌহালী, উল্লাপাড়া পাবনার জেলার তাঁতপল্লী যেন এখন ব্যস্ত নগরী। দম ফেলারও সময় নেই তাঁত মালিক ও শ্রমিকদের। কাপড়ের উৎপাদন বাড়াতে দিনরাত কাজ করে যাচ্ছেন তাঁত শ্রমিকরা।


    তাঁত মালিক ও শ্রমিকরা জানান, জেলায় এখন তৈরি হচ্ছে আন্তর্জাতিক মানের উন্নত আধুনিক রুচিশীল কাপড়। জামদানি, সুতি জামদানি, সুতি কাতান, চোষা, বেনারসি, শেড শাড়ি ও লুঙ্গি তৈরি হচ্ছে এ তাঁত পল্লীগুলোতে। শাড়ির ওপরে বর্ণিল সুতা, বাক ও চুমকির কাজ করা হচ্ছে। এছাড়া কাপড়ের ওপর প্রিন্ট এবং রঙতুলির আঁচড়ে হাতে করা হচ্ছে নান্দনিক ও মনোমুগ্ধকর নানা নকশা। আর বিভিন্ন নকশার তৈরি কাপড়ের চাহিদা ও সুনাম ছড়িয়ে পড়েছে ভারত, আমেরিকা ও যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশে। 


    সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর ও এনায়েতপুরের খুকনীর তৈরি বেনারসি শাড়ী ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। ব্যবসায়ীদের চাহিদা অনুযায়ী কাপড় সরবরাহ করতে হিমশিম খাচ্ছেন তাঁত  মালিকরা।


    তাঁত মালিকরা জানান, বাজারে কাপড়ের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দামও অনেক বেড়েছে। গত বছরের এ সময়ের চেয়ে বেশি দামে কাপড় কিনতে হচ্ছে ক্রেতাদের। এজন্য রঙ-সুতাসহ তাঁত উপকরণের মূল্য বৃদ্ধিকেই দায়ি করছেন তারা।


    সরেজমিনে তাঁত প্রধান এলাকা খুকনী, এনায়েতপুর, বেতিল, ও বেলকুচি এলাকা ঘুরে দেখা যায়, কারখানা মালিক ও শ্রমিকরা ব্যস্ত সময় পার করছেন শাড়ি, লুঙ্গী তৈরিতে। বসে নেই নারীরাও। পুরুষের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নলীভরা, সুতাপারি করা, মাড়দেয়া ও রংতুলিতে নকশা আঁকাসহ কাপড় বুননের কাজেও সহযোগিতা করছেন ওই এলাকার নারীরাও।


    সিরাজগঞ্জ চেক ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপক আব্দুল মান্নান মোল্লা জানান, এক দশক ধরে সুতা, রঙ ও তাঁত উপকরণের অব্যাহত মূল্যবৃদ্ধি এবং ভারতীয় শাড়ির আগ্রাসনে তাঁত শিল্প বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। অনেক তাঁতি পুঁজি সংকটে পড়ে কারখানা বন্ধ করে দেন। লক্ষাধিক শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েন। 


    এখন আন্তর্জাতিক মান ও সময়োপযোগী ডিজাইন নিয়ে আসায় মৃত ও বিলুপ্ত প্রায় দেশীয় এই তাঁত শিল্পকে প্রাণ ফিরে পেতে শুরু করেছে। এ পেশায় জড়িত সবাই এখন লাভের মুখ দেখছেন।


    তাঁত মালিকরা জানান, চলতি বছরের প্রথম থেকেই তাঁতিদের সফলতা আসতে শুরু করে। এ অঞ্চলের তাঁত পল্লীগুলোতে উন্নতমানের জামদানি, সুতি কাতান, চোষা, সুতি জামদানি, বেনারসি ও শেট শাড়ির পাশাপাশি মোটা শাড়ি, লুঙ্গি, থ্রি-পিস ও থান কাপড় তৈরি হচ্ছে। এসব শাড়ি ও লুঙ্গি দেশের চাহিদা মিটিয়ে এখন ইংল্যান্ড, আমেরিকা, কানাডা, ভারতসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে রপ্তানি হচ্ছে।


    রাজধানী ঢাকার বুটিক হাউজ কে-ক্রাফট তাদের পরিবেশকের মাধ্যমে কানাডা ও আমেরিকায় এবং নগরদোলা বুটিক হাউজ ইংল্যান্ডে বাজারজাত করছে। এছাড়া ঈদের বাজারে সোনার বাংলা টেক্সটাইল, ডিসেন্ট, ইউনিক, স্ট্যান্ডার্ড, আমানত শাহ, রুহিতপুরী, স্মার্ট, অমর, পাকিজা, এটিএম, বোখারী, ফজর আলী, অনুসন্ধান, জেএম, স্কাই, চাচকিয়া, ওয়েস্ট, রঙধনুসহ ১২৫টি ব্র্যান্ডের লুঙ্গি চাহিদা বেড়েছে।

    শাহজাদপুরের পাইকারি কাপড় ব্যবসায়ী আল-হেলাল জানান, ভারতীয় ব্যবসায়ীরা শাহজাদপুর ও আতাইকুলা হাট থেকে প্রতি সপ্তাহে প্রায় ১৫ কোটি টাকার কাপড় কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। তবে দাম গত বছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।


    কলকাতার কাপড় ব্যবসায়ী গোপালচন্দ্র সেন জানান, সিরাজগঞ্জ ও পাবনা অঞ্চলের তৈরি কাপড় কলকাতা শুভরাজ, গঙ্গারামপুর ও পাটনাসহ বড় বড় শহরে বিক্রি হচ্ছে। ভারতের চেয়ে এ দেশের কাপড়ের দাম তুলনামূলক কম, টেকসই এবং উন্নতমানের হওয়ায় তারা এখান থেকে কাপড় কিনছেন।


    তিনি আরও জানান, ভারতের রপ্তানিকারকদের কাছে বাংলাদেশের লুঙ্গির চাহিদা রয়েছে সব চেয়ে বেশি। তারা বাংলাদেশি লুঙ্গি মধ্যপ্রাচ্যেও রপ্তানি করছেন। দেশীয় বিবিআনা, রঙ, কে-ক্রাফট ও নগরদোলাসহ দেশের শীর্ষস্থানীয় বুটিক প্রতিষ্ঠানের কাপড় এখন সিরাজগঞ্জ-পাবনা অঞ্চলে তৈরি হচ্ছে।


    বুটিক হাউজগুলোর নিজস্ব ডিজাইনে রেশম সুতা, খাদি, নয়েল, ডুপিয়ান ও এন্ডি সুতা ব্যবহার করে তাতে প্যালেস ও জরি মিশ্রিত করে কাপড় তৈরি হচ্ছে। বুটিক হাউজের ওড়না, থান কাপড় ও এন্ডি থান কাপড়ের ফেব্রিক্স তৈরি করা হচ্ছে তাঁত পল্লীগুলোতে।


    ঈদ সামনে রেখে স্বর্ণলতা নামে নতুন একটি শাড়ি বাজারে এনেছেন শাহজাদপুর, এনায়েতপুর ও বেলকুচির তাঁতিরা। হাফ সিল্কের ওপর ঝুটের মনমুগ্ধকর নকশা করা। কাপড় খুললেই স্বর্ণের মতো ঝলমল করে বলেই এর নাম রাখা হয়েছে স্বর্ণলতা। ইতোমধ্যেই এ শাড়ি ক্রেতাদের মন কেড়েছে। বাজারে বিক্রি হচ্ছে দুই থেকে তিন হাজার টাকায়।


    স্বর্ণলতা কাপড় প্রস্তুতকারক দরগাপাড়া গ্রামের তাঁতি আজমল কবীর বলেন, রুচিশীল ক্রেতাদের বিষয়টি খেয়াল রেখেই ভারত থেকে জুট এনে তা দিয়ে হাতে বিভিন্ন নকশা করে স্বর্ণলতা শাড়ি তৈরি করা হচ্ছে। এ শাড়ির প্রকৃত নাম সাউথ কাতান। ইতোমধ্যে বাজারে এ শাড়ির চাহিদা আকাশছোঁয়া। তার কারখানায় উৎপাদিত কাপড় আগাম বিক্রি হয়ে যাচ্ছে বলে তিনি জানান।


    পাইকারি বিক্রেতা গোপিনাথপুরের সেলিম রেজা ও গোপরেখীর এসএম সুজন মাহমুদ জানান, দীর্ঘ মন্দার পর ঈদ সামনে রেখে কাপড়ের বাজার চাঙ্গা হয়ে উঠেছে। তাঁতিদের পেছনে  ঘুরে চাহিদা অনুযায়ী কাপড় মিলছে না। ব্যবসায়ীরা অগ্রিম টাকা দিয়ে তাঁতিদের বাড়ি থেকে কাপড় নিয়ে যাচ্ছেন।


    তবে তাঁত শ্রমিক তোরাব আলী ও আব্দুর রহিম জানান, পরিশ্রম অনুযায়ী তারা মজুরি পাচ্ছেন না। তারা সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কাজ করে সপ্তাহে ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা পর্যন্ত মজুরি পান। বাজারে কাপড়ের দাম বাড়লেও তাদের মজুরি বাড়েনি। আগের তুলনায় কাপড় তৈরিতে সময় এবং পরিশ্রম বেশি হলেও মালিক নামমাত্র মজুরি বাড়িয়েছে।


    ঈদ আর পরিবারে বাড়তি আয়ের আশায় তারা রাতদিন কাজ করছেন বলে জানান তারা।

    অনলাইন নিউজ এডিটর ০৯ জুন, ২০১৮ ০৩:৫০ অপরাহ্ন প্রকাশিত হয়েছে এবং 163 বার দেখা হয়েছে।
    পাঠকের ফেসবুক মন্তব্যঃ
    Expo
    Slide background EduTech EduTech EduTech EduTech EduTech EduTech
    Slide background SaleTech SaleTech SaleTech SaleTech SaleTech EduTech
    সিরাজগঞ্জ অন্যান্য খবরসমুহ
    সর্বশেষ আপডেট
    নিউজ আর্কাইভ
    ফেসবুকে সিরাজগঞ্জ কণ্ঠঃ
    বিজ্ঞাপন
    সিরাজগঞ্জ কণ্ঠঃ ফোকাস
    • সর্বাধিক পঠিত
    • সর্বশেষ প্রকাশিত
    বিজ্ঞাপন

    ভিজিটর সংখ্যা
    6211712
    ১৮ জুলাই, ২০১৮ ০৪:৩৭ অপরাহ্ন