মানবতার সেবায় বাংলাদেশে ৪৩ বছর তাড়াশে গুল্টা মিশনের ফাদার কার্লো বুদ্জি পিমে
১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০৯:৫৫ অপরাহ্ন


  

  • তাড়াশ/ মানবসেবা:

    মানবতার সেবায় বাংলাদেশে ৪৩ বছর তাড়াশে গুল্টা মিশনের ফাদার কার্লো বুদ্জি পিমে
    ১২ আগস্ট, ২০১৮ ০২:৫৩ অপরাহ্ন প্রকাশিত

    আশরাফুল ইসলাম রনি:
    জন্মে আমার দেশ ইতালি আর ভালবাসায় আমার দেশ বাংলাদেশ। ১৯৭৫ সালে যুদ্ধ বিধ্বস্ত বাংলাদেশে সুবিধা বঞ্চিত শিশু, নারীসহ মানবতার সেবায় ৪৩ বছর নিজেকে এদেশের প্রত্যন্ত গ্রামে নিজেকে নিয়োজিত রেখে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন সিরাজগঞ্জের তাড়াশে গুল্টা খ্রিষ্টান মিশনারীর পাল পুরোহিত কার্লো বুদ্জি পিমে।
    জানা গেছে, ১৯৪৩ সালের ৬ এপ্রিল ইতালির বিখ্যাত মিলান শহরের কাছাকাছি আরেকটি শহর গরলা মিনরে তাঁর জন্ম। বাবা গাইতান ও মা আন্নার ৯ ছেলে-মেয়ের মধ্যে কার্লো বুদ্জি পিমে সবার ছোট। তিনি মিলান শহরে পড়ালেখা শুরু করেন এবং ইতালি সাহিত্যে ডক্টরেট ডিগ্রী লাভ করেন।এরপর সেখানে শিক্ষকতার কাজে নিয়োজিত হন।  তারপর ১৯৬৮ সালে খ্রিষ্টান ক্যাথলিক ধর্মের অনুসারী পিমে ফাদার হিসেবে অভিসিক্ত হন। এরপর ৩২ বছর বয়সে আন্তর্জাতিক বে-সরকারী উন্নয়ন সংস্থা কারিতাসের মাধ্যমে ১৯৭৫ সালে যুদ্ধ বিধ্বস্ত বাংলাদেশের সুবিধা বঞ্চিত মানুষের সেবায় এদেশে আসেন। তারপর কেটে গেছে জীবন থেকে ৪৩ বছর। বর্তমানে ৭৫ বছর বয়সী ইতালির নাগরিক ফাদার কার্লো বুদ্জি পিমে এদেশের মানুষের ভালবাসায় সিক্ত হয়ে মানুষ ও মানবতার সেবায় নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন নিরলস ভাবে। তিনি জানান, এদেশের মানুষের বিশেষ করে দরিদ্র, সুবিধা বঞ্চিত শিশুদের শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন ধর্মীয় বিষয়ে তাদের পাশে থেকে সেবার হাত উন্মুক্ত রেখেছেন।  তাঁর আশা এদেশের মাটিতেই যেন তাঁর মৃত্যু এবং প্রিয় বাংলাদেশেই তাঁর শেষ শয্যার সমাধি রচিত হয়। যেন শতাব্দির পর শতাব্দি ভালবাসার বন্ধনে বাংলাদেশের মাটি ও মানুষের সাথে একাকার হয়ে থাকতে পারেন। মুলতঃ ফাদার কার্লো বুদ্জি পিমে উত্তরাঞ্চলের নওগাঁ জেলার ধামুর হাটে খ্রিষ্টান মিশনারীতে আশির দশকে সেবামুলক কাজ শুরু করেন। সেখানে শিশুদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবহেলিত পশ্চাৎপদ বিভিন্ন জাতি গোষ্ঠির নারী-পুরুষের জীবন মান উন্নয়নে নিজেকে নিয়োজিত রাখেন প্রায় ৭ বছর। তারই ধারাবহিকতায় ১৯৮৭ সালে পাবনার চাটমোহর উপজেলার ফৈলজানা খ্রিষ্টান পল্লীতে আসেন এবং সেখানকার পিছিয়ে পড়া জন গোষ্ঠির মানুষের সেবায় আতœ নিয়োগ করেন।  পরে নব্বই দশকে সিরাজগঞ্জ জেলা সদরে আসেন।  সেখানে সিরাজগঞ্জ কালেক্টর ভবনের সামনে পারভীন মোড়ে ব্রিটিশ আমলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নিহত সৈনিকদের কবরস্থান রক্ষনাবেক্ষনের কাজ শুরু করেন। প্রাথমিক ভাবে অবহেলিত জরাজীর্ন কবরে শায়িত সৈনিকসহ কবরবাসীদের আতœার শান্তির লক্ষ্যে ওই কবরস্থান সংরক্ষণে অক্লান্ত পরিশ্রম করেন। এতে প্রথমে বাধার সম্মুখিন হলেও তিনি সাহস আর আইনি সহায়তার মাধ্যমে খ্রিষ্টান কবরস্থানটি চিহ্নিত করে দৃষ্টি নন্দন কবরস্থান হিসেবে গড়ে তোলেন। এ ছাড়া বেলকুচি তেঞ্জাসিয়া খ্রিষ্টানদের উপ-ধর্ম পল্লীতে ময়মনসিংহ জেলা থেকে আসা গারো শ্রমিক সন্তানদের শিশু শ্রেণি থেকে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখার দায়িত্ব গ্রহন করেন।  তিনি জানান, তাঁর ইতালিতে থাকা আতœীয়-স্বজন, প্রাক্তন ছাত্র-ছাত্রী ও বন্ধু-বান্ধবদের আর্থিক সহযোগীতায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো তিনি চালু রেখেছেন।  অতপর ২০০০ সালের শেষের দিকে তিনি তাড়াশের গুল্টা খ্রিষ্টান ধর্ম পল্লীর পাল পুরোহিত হিসেবে যোগদান করেন।  সেখানে আদিবাসী শিশুদের শিক্ষায় প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে প্রাক-প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাধ্যমে মাতৃভাষায় শিশু থেকে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার ব্যবস্থা করেন। উদ্দেশ্য আদিবাসী সাদরি, নাগরি, সাঁওতাল শিশুদের মাতৃভাষার মাধ্যমে বাংলা শিখিয়ে স্থানীয় সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে ভর্তির উপযোগী করে গড়ে তোলেন।  এজন্য সিরাজগঞ্জের তাড়াশ, উল্লাপাড়া, রায়গঞ্জ, পাবনার চাটমোহর ও নাটোরের সিংড়া উপজেলার আদিবাসী অধ্যুষিত প্রত্যন্ত গ্রামে স্থানীয় জনগনের সহযোগীতায় ৩৫টি স্কুল চালিয়ে যাচ্ছেন এখনও।
    এ ছাড়া তাড়াশের গুল্টা মিশনে দীর্ঘ ১১ বছর যাবৎ এলাকার আদিবাসীসহ শিক্ষা বঞ্চিত ১৫০ জন ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে খোলা হয়েছে আবসিক বিদ্যা নিকেতন। সেখানে ওই শিক্ষার্থীরা খাওয়া-পড়ার পাশাপাশি বিশেষ কোচিং এর মাধ্যমে বিদ্যালয়ের নিত্য দিনের পড়ালেখার বিষয়টি সম্পন্ন করার সুযোগ পাচ্ছে এবং উচ্চ শিক্ষার মাধ্যমে অনেকেই কর্মক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠালাভ করেছেন। ফাদার কার্লো বুদ্জি পিমে গুল্টা মিশনে প্রশিক্ষিত সিষ্টারদের মাধ্যমে এলাকার গর্ভবতী মা, চিকিৎসা বঞ্চিত নারী ও শিশুদের প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবারও ব্যবস্থা রেখেছেন প্রায় ২০ বছর যাবৎ। এছাড়া প্রায় আট কোটি টাকা ব্যয়ে ইতালির তাঁর আতœীয়-স্বজন প্রাক্তন ছাত্রদের আর্থিক সহযোগীতায় গুল্টা মিশনে আভে মারিয়া নামের একটি দৃষ্টি নন্দন গীর্জা, একটি আধুনিক কমিউনিটি সেন্টার, ফাদারদের জন্য বাসভবন নির্মাণ করেছেন। গুল্টা খ্রিষ্টান ধর্ম পল্লীর সহ-সভাপতি নিখিল খাঁ খাঁ ফাদার পিমের মুল্যায়ন করতে গিয়ে বলেন, তিনি একজন সাদা মনের মানুষ। তাঁর মানবতার সেবায় করা কজগুলো দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে আদিবাসী অধ্যুষিত চলনবিলের এই বৃহৎ এলাকায়। একান্ত আলাপ চারিতায় ফাদার কার্লো বুদ্জি পিমে প্রতিনিধিকে বলেন, ঈশ্বর মানুষকে জন্ম দিয়ে কিছু দায়িত্বও দিয়েছেন। আমি সেই দায়িত্বটা ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের সেবার মাধ্যমে পালনের চেষ্টা করছি মাত্র। কার্লো বুদ্জি পিমে আবেগ তাড়িত হয়ে বলেন, বাংলাদেশ আমার ভালবাসার দেশ। ৪৩ বছরেও এদেশের নাগরিকত্ব না পেলেও তাঁর কোন আক্ষেপ নেই। তিনি বলেন, নাগরিকত্ব পাবার আশায় সময় নষ্ট না করে সুবিধা বঞ্চিত মানুষের সেবায় কাজ করতে ভাল লাগে, তবে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পেলে আমার আপত্তি থাকবে না। তিনি এদেশের সরকার এবং গন-মানুষের সহযোগীতায় তাকে কাজ করতে দেয়ায় তিনি সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।  আপন দেশ হিসেবে বাংলাদেশে দীর্ঘ ৪৩ বছর ধরে নিরলসভাবে কাজ করা ফাদার কার্লো বুদ্জি’র শেষ কথা বাংলাদেশের মানুষের জীবন মান উন্নয়নে বর্তমান অবস্থা তাকে আশান্বিত করেছে।  তিনি আরো বলেন, আমি এদেশের প্রত্যন্ত গ্রামের খেটে খাওয়া মানুষের সেবায় আমৃত্যু কাজ করে যেতে চাই। আর প্রিয় বাংলাদেশের মাটিতেই যেন হয় আমার শেষ সমাধি।

     

    স্টাফ করেস্পন্ডেন্ট, তাড়াশ ১২ আগস্ট, ২০১৮ ০২:৫৩ অপরাহ্ন প্রকাশিত হয়েছে এবং 160 বার দেখা হয়েছে।
    পাঠকের ফেসবুক মন্তব্যঃ
    Expo
    Slide background EduTech EduTech EduTech EduTech EduTech EduTech
    Slide background SaleTech SaleTech SaleTech SaleTech SaleTech EduTech
    তাড়াশ অন্যান্য খবরসমুহ
    সর্বশেষ আপডেট
    নিউজ আর্কাইভ
    ফেসবুকে সিরাজগঞ্জ কণ্ঠঃ
    বিজ্ঞাপন
    সিরাজগঞ্জ কণ্ঠঃ ফোকাস
    • সর্বাধিক পঠিত
    • সর্বশেষ প্রকাশিত
    বিজ্ঞাপন

    ভিজিটর সংখ্যা
    6934406
    ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০৯:৫৫ অপরাহ্ন