উত্তরাঞ্চলের নদ-নদীর বুকে ধুঁ-ধুঁ বালুচর!
১৫ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০৯:৩৩ পূর্বাহ্ন


  

  • উত্তরবঙ্গ/ কৃষি ও খাদ্য:

    উত্তরাঞ্চলের নদ-নদীর বুকে ধুঁ-ধুঁ বালুচর!
    ২৮ নভেম্বর, ২০১৮ ০৭:২৭ অপরাহ্ন প্রকাশিত

    শামছুর রহমান শিশির : এক সময়ের প্রবলা, প্রমত্তা, প্রগলভা, উত্তাল, রাক্ষুসী, স্রোতস্বিনী যমুনা, করতোয়া, বড়াল, হুরাসাগর, নন্দকুজা, বেশানী, আত্রাই, গুমানী, গুর, ফকিরনী, শিববারনই, নাগর, ছোট যমুনা, মুসাখান, নারদ ও গদাইসহ উত্তরাঞ্চলের নদীগুলো শুকিয়ে নদী বক্ষে মাইলের পর মাইল ধুঁ-ধুঁ বালুচর বিরাজ করছে। ভারতের মেরুকরণের কু-প্রভাবে উত্তরাঞ্চলের নদ-নদী গুলোতে বর্তমানে পর্যাপ্ত পানি নেই। আর শাখা নদীগুলোর অবস্থা আরও করুণ। ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক নীচে নেমে গেছে। ফলে এ অঞ্চলের বিভিন্ন ফসলের আবাদের সেঁচ কার্যক্রম বিঘিœত হচ্ছে। বিজ্ঞ মহলের মতে, ‘ভারতের সাথে পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ে বছরের পর বছর শুধু সময়ই অতিবাহিত হচ্ছে। কাজের কাজ কিছু হচ্ছে না। বঙ্গপসাগরের সমুদ্র সীমায় যেভাবে ন্যাটিক্যাল মাইল যোগ হয়েছে ঠিক সেভাবেই আন্তর্জাতিক আদালতের মাধ্যমে পানি প্রাপ্তির ন্যায্য হিস্যার বিষয়টি সমাধান করা যেতে পারে। এর ব্যাত্যয় হলে বর্তমানের উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন নদী বক্ষ পরিণত হবে মরুভূমিতে।’
    বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, গত ১৯৫৪ ও ১৯৫৫ সালের ভয়াবহ বন্যার পর খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধিতে ১৯৫৭ সালে জাতিসংঘের অধীনে ক্রুগ মিশন এর সুপারিশক্রমে পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়নের লক্ষে ১৯৫৯ সালে পূর্ব পাকিস্থান পানি ও বিদ্যূৎ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (ইপিওয়াপদা) গঠন করা হয়। পানি উন্নয়ন বোর্ড (বাপাউবো) ইপিওয়াপদা এর পানি উইং হিসাবে দেশের বন্যা নিয়ন্ত্রন, পানি নিষ্কাষন ও সেঁচ প্রকল্প বাস্তবায়ন করে কৃষি ও মৎস সম্পদের উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষে দেশের পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনায় প্রধান সংস্থা হিসাবে কার্যক্রম শুরু করে। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে মহামান্য রাষ্ট্রপতির আদেশ নং-৫৯ মোতাবেক ইপিওয়াপদা এর পানি অংশ একই ম্যান্ডেট নিয়ে বাংলাদেশ বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (বাপাইবো) সম্পূর্ণ স্বায়ত্বশাসিত সংস্থা হিসাবে আতœপ্রকাশ করে। এরপর পর্যায়ক্রমে সংস্কার ও পুনর্গঠনের ধারাবাহিকতায় জাতীয় পানি নীতি-১৯৯৯ ও জাতীয় পানি ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা-২০০৪ এর  সাথে সামঞ্জস্য রেখে বাপাউবো আইন-২০০০ প্রণয়ন করা হয়। এ আইনের আওতায় মন্ত্রী, পানি সম্পদ মন্ত্রনালয় এর নেতৃত্বে ১৩ সদস্য বিশিষ্ট পানি পরিষদের মাধ্যমে বোর্ডের শীর্ষ নীতি নির্ধারণ ও ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে আসছে। 
    সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞমহলের মতে, ‘উত্তরাঞ্চলের নদ-নদী, খাল-বীল শুকিয়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ ভারতের মরুকরণ প্রক্রিয়া। দেশের পানি হিস্যা আদায়ে বহুমুখী পরিকল্পনা ও কর্মপন্থার কথা বলা হলেও ভারত সরকারের পক্ষ থেকে উল্লেখযোগ্য সাড়া মেলেনি আজও। আগামীতেও যে ভারত তাদের সিদ্ধান্তে অটল থাকবে সে বিষয়টিও ভাবা মোটেই অমূলক নয়। তাই আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা দায়ের করে যদি ২০০ ন্যাটিক্যাল মাইল সমুদ্রসীমা অর্জন করতে পারি, তাহলে কৃষিপ্রধান এ দেশকে রক্ষায় কেন আন্তর্জাতিক আদালতের মাধ্যমে মামলা দায়ের করে দেশের নদ-নদীগুলোতে নদী বক্ষে স্বাভাবিক পানি প্রবাহ নিশ্চিত করতে পারবো না? এ অঞ্চল ও কৃষিপ্রধান দেশকে রক্ষায় পানির ন্যায্য হিস্যা আদয়ে আন্তর্জাতিক আদালতের হস্তক্ষেপ ছাড়া আর কোন যৌক্তিক উপায় আছে বলেও পরিলক্ষিত হয় না।’ 
    খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নদী ভারতের মরুকরণ প্রক্রিয়ার ফলে শুষ্ক মৌসুমে যৌবন হারিয়ে যমুনা, পদ্মা, করতোয়া, বড়াল, হুরাসাগর, নন্দকুজা, বেশানী, আত্রাই, গুমানী, গুর, ফকিরনী, শিববারনই, নাগর, ছোট যমুনা, মুসাখান, নারদ ও গদাইসহ উত্তরাঞ্চলের নদীগুলো পানিশূন্য প্রায় হয়ে পড়েছে। ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর অতীতের তুলনায় উদ্বেগজনক হারে নীচে নেমে যাওয়ায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। পাশাপাশি শাখা নদী, খাল-বিল শুকিয়ে পর্যাপ্ত পানি প্রাপ্তি ব্যাহত হচ্ছে। নদী তীরবর্তী অঞ্চলের গভীর-অগভীর নলকূপ থেকে পর্যাপ্ত পানি পাওয়া যাচ্ছে না। এ কারণে দেশের কৃষি অর্থনীতিতে মারাত্বক বিরূপ নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশংকা তৈরি হয়েছে। নদী নীর্ভর এ অঞ্চলে ভ-ূগর্ভস্থ পানির অপরিকল্পিত ও অতিমাত্রায় ব্যবহার এবং সেঁচ কাজে পানির অপচয় রোধ করা না গেলে বাংলাদেশ এক মহাসংকটের মুখোমুখি হবে বলে বিশেষজ্ঞরা হুশিয়ারী উচ্চরণ করেছেন। এ অঞ্চলের এক সময়ের ভয়াল, উত্তাল অনেক নদী ও শাখানদী বক্ষে বর্তমানে পর্যাপ্ত পানি আর দেখা যাচ্ছে না। করতোয়ার পরিণতিও বর্তমানে একই পথে! নাব্যতা সংকট, বাস যোগ্য পানি ও প্রতিকূল পরিবেশ বিরাজ করায় উত্তরাঞ্চলের নদী থেকে দেশীয় বিভিন্ন প্রজাতির মাছ নিঃশ্চিহ্নের পথে! এসব কারণে এ অঞ্চলের নদী নীর্ভর কৃষক ও এলাকাবাসীর বুকভরা আশা ক্রমশঃ হতাশায় নিমজ্জিত হচ্ছে। এছাড়া এসব নদীগুলোতে প্রয়োজনীয় পানি না থাকায় একদিকে যেমন নৌ-চলাচল মারাত্বকভাবে বিঘিœত হচ্ছে, অন্যদিকে ভবিষ্যতে জাতীয় অর্থনীতিতেও এর বিরূপ প্রতিক্রিয়া পড়ার শংকা বিরাজ করছে। 
    যমুনা নদী তীরবর্তী শাহজাদপুর এলাকার বেশ কয়েকজন বয়োবৃদ্ধর মতে, ‘ছোট বেলায় তারা ভয়াল-উত্তাল যমুনা, পদ্মা, করতোয়া, বড়াল, হুরাসাগর, নন্দকুজা, বেশানী, আত্রাই, গুমানী, গুর, ফকিরনী, শিববারনই, নাগর, ছোট যমুনা, মুসাখান, নারদ ও গদাইসহ উত্তরাঞ্চলের নদীগুলোর এপাড় (পশ্চিম) থেকে ওপারে (পূর্ব) তাকালে চোখে পড়তো দিগন্তছোঁয়া পানি আর পানি আর এখন চোখে পড়ে ধুঁ-ধুঁ বালু চর। বিজলী বাতি জ্বলা জাহাজ তো দুরের কথা! পানির অভাবে পালতোলা নৌকাও খুব একটা দেখা যায় না। এসব নদীগুলো আগে ভূখন্ড থেকে ৫ মানুষ সমান (দীর্ঘ) বা ৩০ ফুট গভীরে শুষ্ক মৌসুমে পানির স্তর পাওয়া গেলেও তদস্থলে ১২/১৩ মানুষ সমান (দীর্ঘ) বা ৬০/৬৫ ফুট গভীরেরও অনেক নীচে পানির স্তর নেমে গেছে। ফলে উত্তরাঞ্চলের নদীগুলোর বিস্তুৃর্ণ জলসীমা ক্রমেই সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে ও বালির চরের প্রশস্ততা বাড়ছে। মরুকরণের কু-প্রভাবে উত্তরাঞ্চলের জীব বৈচিত্র হুমকির সন্মুখীন হয়ে পড়েছে। মারাত্বকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে এ অঞ্চলের কৃষক।
    তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, এ অঞ্চলের স্রোতস্বিনী যমুনা, পদ্মা, করতোয়া, বড়াল, হুরাসাগর, নন্দকুজা, বেশানী, আত্রাই, গুমানী, গুর, ফকিরনী, শিববারনই, নাগর, ছোট যমুনা, মুসাখান, নারদ ও গদাইসহ উত্তরাঞ্চলের নদীগুলো ও এর বেশক’টি শাখানদীসহ খাল-বিল শুকিয়ে গেছে। ফলে নদ-নদী বিধৌত উত্তরাঞ্চলবাসীর শুরু হয়েছে দুঃখ দুর্দশার পালা। প্রকৃতি নীর্ভর কৃষিপ্রধান এ অঞ্চলের বিস্তৃর্ণ এলাকা হয়ে যাচ্ছে মিনি মরুভূমি। দ’ুচোখ যেদিকে যায় সেদিকেই দেখা যায় ধূঁ-ধূঁ বালুচর। প্রতিবেশী দেশ ভারত নদ-নদীগুলোর স্বাভাবিক গতিপথ রূদ্ধ করে দেওয়ায় সুজলা-সুফলা, শষ্য-শ্যামলা বাংলাদেশ ক্রমান্বয়ে মরু অঞ্চলে পরিণত হতে চলেছে। উত্তরাঞ্চলের বিস্তৃত এলাকা জুড়ে নদীগুলো অবস্থান করায় মরুকরণের কু-প্রভাব এ অঞ্চলের প্রাকৃতিক পরিবেশকে করছে ভারসাম্যহীন। এসব কারণে এ অঞ্চলের নদীগুলোর গতি প্রকৃতির পরিবর্তন ঘটছে। আমরা হারাতে বসেছি আমাদের অনেক গ্রামীন ঐহিত্য। আবহমান কাল থেকে গ্রামীন জনপদের মানুষের প্রিয় সুস্বাদু দেশী মাছ এখন সোনার হরিণের মতো। এখন আর দেখা যায়না গ্রামীন ঐহিত্যের অনুসঙ্গ নৌকা বাইচ, খরা জাল, সূতি ফাঁদ, সেঁচের মাধ্যম দাঁড়। মৎসভান্ডার সংকুচিত বা শুকানোর ফলে অনেক মৎসজীবী বর্তমানে বেকার। আবার অনেকেই পেশার পরিবর্তন করতে বাধ্য হচ্ছে।
    পানিসম্পদ বিষয়ক গবেষকদের মতে, ভারতের মরুকরণ প্রক্রিয়ার যমুনা, করতোয়া, বরাল, হুরাসাগর, নন্দকুজা, বেশানী, আত্রাই, গুমানী, গুর, ফকিরনী, শিববারনই, নাগর, ছোট যমুনা, মুসাখান, নারদ ও গদাইসহ উত্তরাঞ্চলের নদীগুলো নদীর পানির স্তর ভূগর্ভস্থ পানির স্তরেরও নীচে নেমে গেছে। সরাসরি এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে অসংখ্য  শাখা নদী ও নালা গুলোতে। এ দুরবস্থার আরও একটি কারণ হচ্ছে যমুনা নদী অববাহিকায় অপরিকল্পিত ও অনিয়ন্ত্রিতভাবে অতিমাত্রায় অগভীর নলকূপের ব্যবহার। এতে মরা খালে পরিনত হচ্ছে উত্তরাঞ্চলের নদ-নদী, চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে কৃষি, মৎসসহ প্রকৃতি নীর্ভর বহুমূখী খাতগুলো যার নেতিবাচক সরাসরি প্রভাব পড়ার আশংকা সৃষ্টি হয়েছে জাতীয় অর্থনীতিতে। 
    বিশেষজ্ঞ মহলের মতে, ‘ভারতের সাথে পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ে আন্তর্জাতিক আদালতের মাধ্যমে কৃষিপ্রধান এ দেশের পানির সমস্যার সমাধান করা যেতে পারে, যার উৎকৃষ্ট নজির হতে পারে বিশাল সমুদ্রসীমা বিজয়ের ঘটনা’। 
    সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট, শাহজাদপুর ২৮ নভেম্বর, ২০১৮ ০৭:২৭ অপরাহ্ন প্রকাশিত হয়েছে এবং 96 বার দেখা হয়েছে।
    পাঠকের ফেসবুক মন্তব্যঃ
    Expo
    Slide background EduTech EduTech EduTech EduTech EduTech EduTech
    Slide background SaleTech SaleTech SaleTech SaleTech SaleTech EduTech
    উত্তরবঙ্গ অন্যান্য খবরসমুহ
    সর্বশেষ আপডেট
    নিউজ আর্কাইভ
    ফেসবুকে সিরাজগঞ্জ কণ্ঠঃ
    বিজ্ঞাপন
    সিরাজগঞ্জ কণ্ঠঃ ফোকাস
    • সর্বাধিক পঠিত
    • সর্বশেষ প্রকাশিত
    বিজ্ঞাপন

    ভিজিটর সংখ্যা
    7987564
    ১৫ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০৯:৩৩ পূর্বাহ্ন