যুদ্ধশিশু মেরিনা মায়ের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি চান
১৬ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০৬:১৯ পূর্বাহ্ন


  

   সর্বশেষ সংবাদঃ

  • জাতীয়/ আমাদের মুক্তিযুদ্ধ:

    যুদ্ধশিশু মেরিনা মায়ের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি চান
    ০১ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০৪:১৩ অপরাহ্ন প্রকাশিত

    আশরাফুল ইসলাম রনি:
    'এখনও আকাশে বিমান দেখলে ভয়ে চমকে উঠি। মায়ের কথা মনে পড়ে যায়। বাবার নামধাম কিছু নাই, আমাকে নিয়ে তাই তার চিন্তার শেষ ছিল না। বড় হলে কী হবে, কোথায় কার সঙ্গে বিয়ে হবে, তা নিয়ে খুব চিন্তা করতেন তিনি। তাই আকাশে বিমান দেখলেই বলে উঠতেন, ওই বিমানে করে তোকে বাপের দেশে পাঠিয়ে দেব।'
    বলতে বলতে চোখ মোছেন মেরিনা খাতুন। কানাডা, অস্ট্রেলিয়া কিংবা ইউরোপের কোনো রাষ্ট্রে নয়- স্বদেশেই বেড়ে উঠেছেন একাত্তরের এই যুদ্ধশিশু। এখনও পিতৃপরিচয় নিয়ে কথা শুনতে হয়, কখনোবা না খেয়ে থাকতে হয় বাংলাদেশের সমান বয়সী মেরিনাকে। যদিও দেশের মানুষেরই উচিত ছিল তার পাশে দাঁড়ানো। তবু মেরিনার সুখ এইখানে- বিদেশ থেকে এসে মাকে খুঁজে পাওয়ার জন্য হন্যে হতে হয় না তাকে। যুদ্ধশিশু হওয়ায় তাকে অনেক অপমান-অবহেলা-কষ্ট সহ্য করতে হলেও তার আত্মতৃপ্তি এই- মায়ের স্নেহেই বেড়ে উঠেছেন তিনি। সুখে-দুঃখে মা তার পাশেই ছিলেন।
    সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার ওয়াপদা উত্তর বাঁধ পাড়ার মেরিনার এখন একটাই প্রত্যাশা, স্বাধীনতা ও বিজয়ের পাঁচ দশক পূর্তির আগেই তার মা পচী বেওয়াকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হোক। আর তাড়াশের বিশিষ্টজনের দাবি, একই সঙ্গে মেরিনাকেও স্বীকৃতি দেওয়া হোক যুদ্ধশিশুর।
    তাড়াশের অনেকেই জানেন কী ঘটেছিল পচী বেওয়ার জীবনে। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সদস্যরা ক্যাম্প করেছিল তাদের এলাকায়। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর মে-জুন মাসের কোনো এক সময়ে তারা বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যায় তাকে। ক্যাম্পে আটকে রেখে দিনের পর দিন তাকে ধর্ষণ করা হয়। কিছুদিন পর বাড়িতে ফেরত পাঠালেও মাঝেমধ্যেই সেখানে চলে আসত পাকিস্তানি অথবা তাদের সহযোগী রাজাকার-শান্তি বাহিনীর লোকজন। দিনের পর দিন ধর্ষণের এক পর্যায়ে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েন তিনি।
    চার ছেলে ও দুই মেয়েকে নিয়ে সুখের সংসার ছিল পচী বেওয়ার। মুক্তিযুদ্ধের বছর দুয়েক আগে হঠাৎ করেই মারা যান তার স্বামী ফাজিল আকন্দ। চোখে-মুখে অন্ধকার নেমে আসে তার। এরপর মুক্তিযুদ্ধের সময়কার এই দুর্বিষহ ঘটনায় মানসিকভাবে আরও বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন তিনি। মুক্তিযুদ্ধ শেষ হয় বটে, এর পর শুরু হয় তার নিজস্ব যুদ্ধ। দেশের স্বাধীনতার জন্য তিনি ধর্ষিতা হয়েছিলেন পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকারদের কাছে; এবার লাঞ্ছিত হতে থাকেন স্বাধীন দেশের মানুষের কাছে। মায়ের কাছ থেকে শোনা সেসব দিনের কথা বলতে গিয়ে যুদ্ধশিশু মেরিনার চোখও সজল হয়ে ওঠে। অপমানিত ও অতিষ্ঠ পচী বেওয়া একদিন ঠিক করেন, সমাজের মানুষের বিষমাখা কথাবার্তা শোনার চেয়ে বিষপান করে আত্মহত্যা করবেন তিনি। তবে কীটনাশক পান করলেও শেষ পর্যন্ত মৃত্যু ঘটেনি তার মায়ের- সহৃদয় কয়েকজন বাঁচিয়ে তোলেন তাকে। বেঁচে যায় পেটের সন্তানও। ১৯৭২ সালের মাঝামাঝি জন্ম নেন যুদ্ধশিশু মেরিনা। শুরু হয় পচী বেওয়ার নতুন এক সংগ্রাম।
    মেরিনার মা বিধবা হন মুক্তিযুদ্ধের বছর দুই আগে- ১৯৬৮ সালের দিকে। এসব তথ্য ঠিকমতো দিতে পারবেন, এমন কেউ বেঁচে নেই। চার ছেলে ও দুই মেয়েকে রেখে আকস্মিকভাবেই মারা যান পচীর স্বামী। তার পর মুক্তিযুদ্ধের সময় এমন বিপর্যয়ের মুখে পড়ে দিশেহারা হয়ে পড়েন পচী। তার কাছ থেকে মেরিনা পরে গল্পে গল্পে জানতে পেরেছিলেন, কেউই তার মাকে তখন কাজ দিতে চাইত না। মফস্বল এলাকায় তেমন কাজও পাওয়া যেত না। পিতৃপরিচয় না থাকায় ঘরের কাজও দিতে চাইত না কেউ তাকে। কেউ আবার চাইত নামমাত্র পারিশ্রমিক দিতে। পচীর তিন ছেলে আগেই আলাদা সংসার পেতেছিল, মেয়েদেরও বিয়ে হয়ে গিয়েছিল। সব মিলিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েন তিনি। তবে তাড়াশের মুক্তিযোদ্ধা প্রয়াত মোবারক হোসেন বরাবরই পচীকে সাহস জোগাতেন এবং নানাভাবে সাহায্যও করতেন বলে জানান মেরিনা। শত দারিদ্র্যের মধ্যেও মা আর তার ছোট ছেলে হাসেন আলী ফুটফুটে মেরিনাকে বড় করে তোলেন। তাকে এতিমখানায় কিংবা দত্তক দিয়ে দেওয়ার পরামর্শ অনেকেই দিয়েছেন পচী বেওয়াকে, কিন্তু তিনি তাতে রাজি হননি।
    পচী বেওয়ার ঘনিষ্ঠ সখী ছিলেন একই এলাকার ওমরজান। পচী বেওয়ার পাশে দাঁড়ান তিনি। নিজের ছেলে ওমরের সঙ্গে তিনি মেরিনার বিয়ের প্রস্তাব দেন। ১৯৮৪ সালে ১২ বছর বয়সে বিয়ে হয় মেরিনার। দীর্ঘ ৩৪ বছর সুখে-দুঃখে একসঙ্গেই আছেন তারা। মেরিনা জানান, এ জন্য তার স্বামীকেও নানাজনের নানা কথা শুনতে হয়েছে। তবে দীর্ঘ সাড়ে তিন দশকের দাম্পত্যজীবনে স্বামী তাকে কখনও কষ্ট দেননি; বরং বন্ধুর মতো সহযোগিতা করেছেন, সহমর্মিতা দিয়েছেন। তিন ছেলে ও এক মেয়ে তাদের। তাদের মধ্যে বড় ছেলে মিজানুর রহমান মিলন (৩০) ও মেয়ে উম্মে হানীর (২৫) বিয়ে হয়েছে।
    ওয়াপদা বাঁধ পাড়ায় মাত্র পাঁচ শতাংশ জমির ওপর টিনশেড ঘরে স্বামী আর সন্তানদের নিয়ে বাস করেন মেরিনা। ভূমিহীন এই পরিবারের সদস্যসংখ্যা ১০। এই বয়সেও অটোভ্যান চালাতে হয় স্বামী ওমরকে। তা ছাড়া উপার্জনক্ষম ছেলে মিলন তাড়াশ বাজারে ফুটপাতের ওপর চা বিক্রি করেন। সরকারি সাহায্য হিসেবে মাসে ৩০ কেজি ভিজিএফ চাল পান মেরিনা। তাছাড়া স্বামী ও ছেলে যে উপার্জন করেন, সব মিলিয়েও এত বড় সংসার চলে না তাদের। এদিকে নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়েছেন তিনি। ওষুধ কিনতে হিমশিম খেতে হয় তাকে।
    মেরিনার এখন একটাই চাওয়া- মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তার বীরাঙ্গনা মায়ের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি। শুধু তার মা পচী বেওয়ার নন- তাড়াশের আরও দুই বীরাঙ্গনা বাতাসী খাতুন ও অর্চনা রানী সিংহের মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি চান তিনি। ২০০৫ সালে পচী বেওয়ার মৃত্যু ঘটে। তাড়াশ উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আরশেদুল ইসলাম অনেক আগে থেকেই পচী বেওয়া যাতে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পান ও সরকারি তালিকাভুক্ত হন, সে চেষ্টা করে আসছেন। তিনি জানান, সংশ্নিষ্ট মন্ত্রণালয়ে তাড়াশের বীরাঙ্গনাদের ব্যাপারে আবেদন জানালেও এখনও কোনো কাজ হয়নি। গেরিলা বাহিনী পলাশডাঙ্গা যুব শিবিরের মুক্তিযোদ্ধা সাইদুর রহমান সাজু বলেন, যুদ্ধের পর পরই তারা পচী বেওয়ার ধর্ষিত ও নির্যাতিত হওয়ার কথা জানতে পারেন। দেশের মধ্যেই যুদ্ধশিশু মেরিনাকে তিনি যেভাবে আগলে রেখেছেন, তা এক অনন্য দৃষ্টান্ত। মেরিনাকে যুদ্ধশিশু হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সপক্ষের এই সরকারের প্রতি জোর আহ্বান জানান তিনি।
    তাড়াশ প্রেস ক্লাবের সভাপতি ও কলেজ শিক্ষক সনাতন দাশ জানান, স্থানীয়ভাবে মেরিনাকে তারা নানাভাবে সহযোগিতা করেছেন। তবে এসবের চেয়ে বড় কথা হলো, যুদ্ধশিশু হিসেবে তাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হোক।

     

    স্টাফ করেস্পন্ডেন্ট, তাড়াশ ০১ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০৪:১৩ অপরাহ্ন প্রকাশিত হয়েছে এবং 127 বার দেখা হয়েছে।
    পাঠকের ফেসবুক মন্তব্যঃ
    Expo
    Slide background EduTech EduTech EduTech EduTech EduTech EduTech
    Slide background SaleTech SaleTech SaleTech SaleTech SaleTech EduTech
    জাতীয় অন্যান্য খবরসমুহ
    সর্বশেষ আপডেট
    নিউজ আর্কাইভ
    ফেসবুকে সিরাজগঞ্জ কণ্ঠঃ
    বিজ্ঞাপন
    সিরাজগঞ্জ কণ্ঠঃ ফোকাস
    • সর্বাধিক পঠিত
    • সর্বশেষ প্রকাশিত
    বিজ্ঞাপন

    ভিজিটর সংখ্যা
    7995151
    ১৬ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০৬:১৯ পূর্বাহ্ন