কাজিপুরের নিবেদিত ছাত্র অন্তপ্রাণ প্রধান শিক্ষক আব্দুল মান্নান
১৭ জানুয়ারী, ২০১৯ ০৬:২০ অপরাহ্ন


  

  • কাজিপুর/ অন্যান্য:

    কাজিপুরের নিবেদিত ছাত্র অন্তপ্রাণ প্রধান শিক্ষক আব্দুল মান্নান
    ০৯ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০৫:৪৪ অপরাহ্ন প্রকাশিত

    আবদুল জলিলঃ কথায় আছে সুস্থ শরীরে সুন্দর মনের বাস। আর এই দুইয়ের মাঝে বেঁচে থাকে শিক্ষা যা মনুষ্যত্ব গঠনে পুরোভাগে ভূমিকা রাখে। শিক্ষা গ্রহণের জন্য (Sound mind in a Sound body )  র গুরুত্ব অপরিসীম। শরীরকে সুস্থ রাখতে ক্রীড়ার বিকল্প নাই- এই কথাগুলোকে যিনি বিশ্বাস করেন এবং হৃদয়ে ধারণ করে শিক্ষকতা পেশায় নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন তিনি হ আবদুল মান্নান; কাজিপুরের ঐতিহ্যবাহী আলমপুর এনএম উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক।

     

     তার যাপিত জীবনে একাধিক স্কুলের শিক্ষকতা করার পাশাপাশি যেখানেই গেছেন সেখানেই সাহিত্য-শিল্প-সংস্কৃতি ঋৃদ্ধ সৃজনশীল মানবিক বাংলাশের একজন অগ্রগামী সৈনিক হিসেবে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন। শুদ্ধ সংস্কৃতির ধারক ও বাহক এই শিক্ষক তাই একজন সাদা মনের মানুষ।

     

    ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি প্রধান শিক্ষক হিসেবে বর্তমান বিদ্যালয়ে যোগদান করেন। শুরুতে তার স্কুলে তেমন শিক্ষার্থী না থাকলেও তার গতিশীল নেতৃত্বে অন্য শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের উদ্বুদ্ধকরণের মাধ্যমে তিনি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সংখ্যা যেমন বৃদ্ধি করেছেন তেমনি ফলাফলের দিক থেকেও উপজেলার শীর্ষ ফলাফলকারী বিদ্যালয়ের তালিকায় তার বিদ্যালয়ের নাম উচ্চারিত হয়।

     

    ক্রীড়া শিক্ষায় তার অবদান স্মরণীয়। নিজ বিদ্যালয়ে তিনি  ১টি ফুটবল ও ১টি ক্রিকেট টিম গঠনে ব্রতী হন। তার চিন্তন অনুযায়ী এ জন্য বেছে নেন ৬ষ্ঠ ও ৭ম শ্রেণির ছাত্রদের। তিনি বিশ্বাস করেন কোন শিক্ষার বুনিয়াদ গঠনের জন্য এই বয়সটিই উপযুক্ত। তাছাড়া এইসব শিক্ষার্থীদেরকে দীর্ঘমেয়াদী  সময়ের জন্যে পাওয়া যাবে।  দীর্ঘদিন অনুশীলনের তারা বেশি পরিণত হয়ে উঠবে। তার ইচ্ছে  ২০২০ সাল নাগাদ এই দল দুটোকে সিরাজগঞ্জ জেলার সেরা দলে পরিণত করা। এ থেকে বিদ্যালয়ের অন্যান্য ছাত্ররা বিশেষ করে পরবর্তী জেনারেশন অনুপ্রাণিত হবে বলে তার দৃঢ় বিশ্বাস। 


     উন্নত ক্রীড়া নৈপূণ্যে প্রশিক্ষিত করার জন্য এরই মধ্যে তিনি মাননীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রির সুপারিশ সম্বলিত একটি দরখাস্ত জাতীয় ক্রীড়া পরিদপ্তরের পরিচালক বরাবর পাঠিয়েছেন যাতে করে জাতীয় পর্যায়ের প্রশিক্ষকের অধীনে এদের প্রশিক্ষণ কর্মশালার আয়োজন করা সম্ভব হয়। তিনি বিশ্বাস করেন এই খেলোয়াড়দের মধ্য থেকেই তৈরি হবে একজন সাকিব, তামিম, মুশফিক, মুন্না কিংবা ওয়ালী ফয়সাল। এজন্য তিনি সকলের সহযোগিতা কামনা করেছেন। 


    ৫০ পেরোনো বয়সেও তাকে দেখা গেছে রীতিমত ড্রেস আপ করে এ-ক্ষুদে খেলোয়াড়দের অনুশীলনে নেতৃত্ব দিতে। তিনি এই প্রতিবেদককে জানান, ফজর নামাজ শেষ করে একটানা ২-৩ ঘন্টা অনুশীলন করান খেলোয়াড়দের। বাড়তি পরিশ্রম হলেও এজন্য তিনি কোন পারিশ্রমিকের আশা করেন না। তার প্রত্যাশা এরা যেদিন এক একজন পরিণত খেলোয়াড় হবে তখনি তার স্বপ্ন পূরণ হবে। তিনি দুঃখ করে বলেন, ২-৩ ঘন্টা পরিশ্রমের পর এদেরকে ভাল ডায়েট দেয়া প্রয়োজন।

     

    কিন্তু বিদ্যালয়ের আর্থিক দৈন্যের কারণে এদেরকে ১টি করে ডিম পর্যন্ত খাওয়াতে পারি না। অথচ এদেশে এমনসব মানুষ আছেন যাদের দামী দামী খাবারের উচ্ছিষ্ট ডাস্টবিনে স্থান পাচ্ছে। তিনি আরো বলেন, সুন্দর পোশাক খেলোয়াড়ের মনে সতেজতা বৃদ্ধি করে এবং ব্যক্তিত্ব বিকাশে সহায়ক হয়। কিন্তু এলাকার বেশির ভাগ ছাত্র অভিভাবকই ভূমিহীন। তাই ছেলেকে একজোড়া বুট জুতা বা ১টি ভাল জার্সি কিনে দেয়ার সঙ্গতি কারও নেই। 

     

     ২০১১ সালের জানুয়ারী মাস পর্যন্ত বিদ্যালয়টিতে কোন বৈদ্যুতিক সংযোগ ছিল না।  প্রধান শিক্ষক হিসেবে ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারী মাসের ১ তারিখে অত্র বিদ্যালয়ে নিয়োগ প্রাপ্তির পরপরই তিনি এ-দিকে দৃষ্টি দেন। তার ঐকান্তিক সহযোগিতায় দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিদ্যুতের সংযোগ দেয়া হয়। বর্তমানে বিদ্যালয়টি বিদ্যুতে স্বয়ং সম্পূর্ণ। বিদ্যুৎ না থাকলে যাতে ক্লাশ পরিচালনায় বিন্দু মাত্র ব্যাঘাত না ঘটে সেজন্য শিক্ষকদের কাছ থেকে চাঁদা তুলে তিনি সার্বক্ষণিক বৈদ্যুতিক ব্যবস্থার জন্য জেনারেটর ক্রয় করেন। 


    প্রচন্ড দাবদাহে পুরাতন টিনের ঘরগুলোতে ক্লাশ করতে কচিকাচা শিক্ষার্থীদের অসহনীয় যন্ত্রণা তাকে ভীষণভাবে পীড়া দেয়। এই অবস্থার নিরসনে তিনি সহায়তা চান টেনিস নামে অত্র এলাকার এক প্রবাসী বাংলাদেশীর কাছে। তিনি ১৫ দিনের মধ্যে ৪৪টি সেলিং ফ্যান দান করে শিক্ষার্থীদের দূর্বিসহ গরমের হাত থেকে রক্ষা করেন। কৃতজ্ঞচিত্তে প্রধানশিক্ষক ওই দানশীল ব্যক্তির জন্যে বিশেষ মুনাজাতের আয়োজন করেন।

     


     প্রধান শিক্ষক বলেন, উদ্দেশ্য সৎ থাকলে কোন কাজ আটকে থাকে না। এরপর তিনি উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার ও কাজিপুর উপজেলা চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ মোজাম্মেল হক বকুল সরকারের ঐকান্তিক সহযোগিতায় বিদ্যালয়ের জন্যে ১টি ল্যাপটপ ও প্রজেক্টর এর ব্যবস্থা করেন। বিদ্যালয়ের পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল সর্ম্পকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি জানান বিদ্যালয়ে এসে তিনি শিক্ষার্থী সংখ্যা পান মাত্র মাত্র ২০০ জন। তাও আবার টিফিনের পরে শ্রেণিতে থাকার প্রবণতা অতি নগণ্য।

     

    নতুন অবস্থায় এভাবে কয়েকদিন দেখার পর একদিন টিফিনের পরে এক ক্লাশে গিয়ে দেখলেন, ৬০ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ৪৫ জন পলাতক। অন্য একজন শিক্ষককে ক্লাশে ঢুকিয়ে দপ্তরীকে সাথে নিয়ে ছুটলেন পলাতক শিক্ষার্থীদের বাড়ী বাড়ী। এতে টনক নড়ে গেল শিক্ষার্থীর অভিভাবকদের। এভাবে ঝড় বৃষ্টি বৈরী আবহাওয়া উপেক্ষা করেও অনুপস্থিত শিক্ষার্থীদের বাড়ী বাড়ী গিয়ে খোঁজখবর নেয়া চলতে থাকলো নিয়মিত। ফলে রেজাল্টও আসলো বেশ ভালো। বর্তমানে আর বাড়ী বাড়ী যেতে হয় না। শিক্ষার্থী উপস্থিতি শতভাগ। তবে কেউ অনুপস্থিত থাকলে তৎক্ষনাৎ ফোন করার জন্য প্রধান শিক্ষকের টেবিলে সার্বক্ষণিক সকল শিক্ষার্থীর Contact  নাম্বার সহ নামের তালিকা রাখা আছে। 


    দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনি জানালেন তার হতাশার কথা। তিনি বললেন, এতকিছুর পরেও আশানুরুপ ফল পাচ্ছি না। কারণ হিসাবে তিনি জানালেন গ্রামটি অত্যন্ত দরিদ্র। গ্রামের বেশির ভাগ মানুষই খেটে খাওয়া। জেলে, দিনমজুর, ভ্যান চালক, ভুটভুটি চালক, অটো চালকের সন্তানরাই এখানে   সন্তানদের ব্যাপারে তারা একেবারেই উদাসীন।

     

    সারাদিন মাঠে ঘাটে পরিশ্রম করার পর রাতে গিয়ে দু’মুঠো খেয়ে ক্লান্তির নিদ্রায় নিমগ্ন হয়ে যায়। তাই বাড়ীতে নজরদারীর কেউ না থাকায় তাদের সন্তানরা পাঠ বিমুখ হয়ে যাচ্ছে। গ্রামের ৪/৫ টা প্রাইমারী স্কুল থেকে ৫ম শ্রেণি পাশ করার পর সামর্থ্য অনুযায়ী তারা ভাল স্কুলে চলে যায়। নিন্ম মেধার শিক্ষার্থীগুলোকে নাড়াচাড়া করে আর কতটুকইু বা করা যায়। তার পরেও তিনি আশা ছাড়েননি। তিনি জানালেন ২০১১ সাল থেকে জেএসসি ও এসএসসিতে পাশের হার শতভাগ।

     

    তবে জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা তুলনামূলক কম। প্রতি বছর ১০, ১২, ১৪ জন করে এ প্লাস পাচ্ছে। এ অবস্থা থেকে উত্তোরণের ব্যাপারে পদক্ষেপের কথা জানতে চাইলে তিনি জানালেন তার স্বপ্নের কথা। তিনি জানালেন, সর্বপ্রথম প্রাতিষ্ঠানিক ভবনের কথা। মাননীয় মন্ত্রি নাসিম সাহেবের সদয় হস্তক্ষেপে অত্র বিদ্যালয়ের ১টি উর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণ ও ১টি চারতলা নতুন ভবনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়া হয়েছে।

     

    এ ভবনদুটি নির্মিত হলে তিনি তার স্বপ্নের স্কুল গড়ে তুলতে সক্ষম হবেন বলে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। প্রত্যেক শ্রেণি থেকে শিক্ষার্থী বাছাই করে বছরের শুরু থেকেই আবাসিক ব্যবস্থা করবেন এবং দরিদ্র শিক্ষার্থীদের জন্য নামমাত্র মূল্যে খাবার ব্যবস্থা করবেন। সার্বক্ষণিক তত্ত্বাবধানের জন্য এখানে প্রয়োজনীয় সংখ্যক হোস্টেল সুপার/ কেয়ারটেকার রাখবেন। দৈনিক, সাপ্তাহিক ও মাসিক মডেল টেস্টের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের পারঙ্গম করে তুলবেন। সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া চর্চার প্রসারের জন্য পৃথক টিম গঠন করবেন। 


    বিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ শাহ আলম জানান, মান্নান স্যারের গতিশীল নেতৃত্বে আমাদের বিদ্যালয়ের লেনদেনের স্বচ্ছতা শতভাগ বজায় রয়েছে। আমাদের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা Open to all সহকারী শিক্ষক থেকে ৪র্থ শ্রেণির কর্মচারী যে কেউ নিত্যকার আয়-ব্যয়ের হিসাব দেখতে পারে। তিনি বললেন টাকা পয়সার ব্যাপারে স্যার যেমন আমাদের আস্থাশীল আমরাও স্যারের উপর পূর্ণ আস্থাশীল। তিনি যোগ করলেন- স্যার বিদ্যালয়ের প্রয়োজনে কোথাও গেলে আমার কাছ থেকে টাকা চেয়ে নেন এবং খরচ বাদে ৫/ টাকা বাঁচলেও তা ক্যাশে ফেরত দেন।


    আব্দুল মান্নান একজন সঙ্গীত শিল্পী। কাজিপুরের জাতীয় পর্যায়ের গান, নৃত্য ও বিতর্ক প্রতিযোগিতায় তার বন্ধু আবদুল জলিল ও আল মানুন খোকনের সাথে  বিচারকের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি কাজিপুর শিল্পকলা একাডেমির একজন সদস্য। জীবনের শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তির কথা জিজ্ঞাসা করলে প্রধান শিক্ষক বললেন ২০১৮ সালে উপজেলার শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক নির্বাচিত হওয়া এবং রাজশাহী বেতারে নিজের গাওয়া গান বাড়িতে বসে রেডিওতে শোনা।

     

    তার আরেকটি স্বপ্ন এখনও অধরা যাকে ধরবার জন্যে তিনি পরিশ্রম করে যাচ্ছেন তা হলো বিদ্যালয়টিকে উপজেলার শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠানে উন্নীত করা। আর এজন্যে তিনি  ছাত্র-অভিভাবক গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ বিশেষ করে সাবেক এমপি শফিকুল ইসলাম, সাবেক মেয়র জনাব আব্দুস ছালাম ও জিএম তালুকদার, ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি জনাব লুৎফর রহমান বিএসসি, হান্নান তালুকদার, রবিউল আওয়ালসহ সবার সহযোগিতাকে কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করেন। স্বপ্নের যাত্রাপথে নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষকমন্ডলী ও কর্মচারীদের সাথে পেয়েছেন বলে তিনি গর্বিত। সবশেষে তিনি জানান, যেতে হবে অনেকদূর। আর  শিক্ষার সোনালী সাফল্যের সে পথে তিনি সৃজনশীল চিন্তা সম্পন্ন মানুষদের পাশে পাবার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। 

    স্টাফ করেসপন্ডেন্ট,কাজিপুর ০৯ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০৫:৪৪ অপরাহ্ন প্রকাশিত হয়েছে এবং 268 বার দেখা হয়েছে।
    পাঠকের ফেসবুক মন্তব্যঃ
    Expo
    Slide background EduTech EduTech EduTech EduTech EduTech EduTech
    Slide background SaleTech SaleTech SaleTech SaleTech SaleTech EduTech
    কাজিপুর অন্যান্য খবরসমুহ
    সর্বশেষ আপডেট
    নিউজ আর্কাইভ
    ফেসবুকে সিরাজগঞ্জ কণ্ঠঃ
    বিজ্ঞাপন
    সিরাজগঞ্জ কণ্ঠঃ ফোকাস
    • সর্বাধিক পঠিত
    • সর্বশেষ প্রকাশিত
    বিজ্ঞাপন

    ভিজিটর সংখ্যা
    8409173
    ১৭ জানুয়ারী, ২০১৯ ০৬:২০ অপরাহ্ন