কাজিপুরে মায়ের কোল বঞ্চিত কুড়ি ভাগ শিশু বেড়ে উঠছে যেভাবে...
১৭ জানুয়ারী, ২০১৯ ০৬:১৫ অপরাহ্ন


  

  • কাজিপুর/ অন্যান্য:

    কাজিপুরে মায়ের কোল বঞ্চিত কুড়ি ভাগ শিশু বেড়ে উঠছে যেভাবে...
    ০৭ জানুয়ারী, ২০১৯ ০২:৩৫ অপরাহ্ন প্রকাশিত

    আবদুল জলিলঃ  সৃষ্টির সেই আদিকাল থেকে মাতৃজঠর এবং মায়ের কোল শিশুর নিরাপদ আশ্রয়স্থল বলে স্বীকৃত। বিশেষ করে ভুমিষ্ট হবার পর থেকে যৌবনে পদার্পন পর্যন্ত সময়টায় শিশুর নিরাপদ ঠাঁই হিসেবে মায়ের কোল, মায়ের স্নেহ -ভালবাসা বেড়ে ওঠার জন্য একান্ত জরুরী। কোন বিশেষ কারণে এর ব্যত্যয়ও যে ঘটেনা তা নয়। কিন্তু সেটা যদি দিনের পর দিন হয় অথবা নিয়মে পরিণত হয় তাহলে সেটা অবশ্যই আলাদা করে ভাববার বিষয়। আর সেই ভাবনার একটা বিশাল অংশ জুড়ে রয়েছে কাজিপুরের কুড়ি শতাংশ শিশুর মায়ের কোল, স্নেহ-মমতা ছাড়াই বেড়ে ওঠার করুণ কাহিনী। 


    মিরন-শ্যামলীর বিয়ে হয়েছে  প্রায় সাত বছর আগে। এরই মধ্যে দু’বছর আগে এই দম্পতির কোলজুড়ে আসে ফুটফুটে শিশুসন্তান জিসান। সরেজমিন কাজিপুরের রেহাইশুড়িবেড় গ্রামে অবস্থিত আমিনা-দৌলতজামান মানবসেবা হাসপাতালে গিয়ে কথা হয় জিসানের দাদীর সাথে। তিনিই খোলাসা করে বললেন ঘটনাটি। তার মেয়ে এবং মেয়েজামাই দুজনেই জীবিকার তাগিদে ঢাকার এক গামের্ন্টস কারখানায় কাজ করেন। বছরে দুই ঈদে বাড়িতে আসে তারা। গত দু’বছর আগে  জিসান এই হাসপাতালেই জন্ম নেয়। তিনমাস ছুটি কাটিয়ে জিসানকে তার নিকট রেখে তার মা চাকরিতে ফিরে গেছে। সেই থেকে নানীর কোলেই বেড়ে উঠছে ঐ শিশু। 


    নাটুয়ারপাড়া চরের আমিনা- নজরুলের দেড় বছর বয়সী শিশুকন্যা নাজমার বেড়ে ওঠার কাহিনী আলাদা। নাজমার মা রেনুকা বিবি জানান, তিনবছর আগে ঢাকায় কারখানায় কাজ করা তার মেয়ে নিজ ইচ্ছায় নজরুলকে বিয়ে করে। কিন্তু বিয়ের পর নজরুল চাকরি ছেড়ে দিয়ে আমিনার উপার্জনে চলতে থাকে। এ নিয়ে দুজনের মধ্যে ঝগড়া হয়। এরই মধ্যে নাজমার জন্ম হয়। দুই মাস বয়সী নাজমাকে রেখে মা আমিনা চলে যায় ঢাকায় চাকরিতে। আর নজরুল সেই থেকে নিরুদ্দেশ। বিধবা রেনুকা বিবির ঐ মেয়ে আমিনা ছাড়া আর কেউ নেই। বাধ্য হয়ে আমিনাকে চাকরির সুযোগ দিতে নাতনীকে নিজের কোলে তুলে নিতে হয়েছে। 


    এই কাহিনী যখন বর্ণনা করছিলেন রেনুকা বিবি, তখন সেখানে উপস্থিত হন শিশু সন্তান কোলে আরেক বিধবা মহিলা । নাম হাজেরা খাতুন। ষাটোর্ধ বয়সী ভগ্নস্বাস্থ্যের ঐ বৃদ্ধার কোলের শিশু তার ছেলের ঘরের নাতী। তিনি জানান, তিনবার যমুনার ভাঙনে বাড়িঘর টানতে হয়েছে। জমি-জিরাত সব গেছে যমুনায়। বাঁচার তাগিদে অষ্টম শ্রেণি পড়–য়া ছেলে গেছে ঢাকায়। সেখানে তিনবছর একজনের বাসায় কাজ করেছে। পরে গামেন্টর্সে চাকরি নেয়ার পরে দুই বছর আগে বিয়ে করেছে তারই এক সহকর্মিকে। তাদের ঘরে সাতমাস আগে ঐ নাতীর জন্ম হয়। সেই থেকে বাবা-মায়ের আদর-¯েœহ বঞ্চিত হয়েই বেড়ে উঠছে শিশুটি। 


    কাজিপুরের প্রায় প্রতিটি গ্রামের দশ পরিবারের কমপক্ষে এক থেকে দুইজন জীবিকার প্রয়োজনে ঢাকায় কাজ করছে। আর তাদের শিশু সন্তানেরা বেড়ে উঠছে তাদের নানী-দাদী, খালা, ফুপু অথবা নিকটাত্মীয়দের সান্নিধ্যে। এসব পরিবারের এমন পরিণতির কাহিনীর বেশিরভাগ স্থান জুড়ে আছে যমুনার ভাঙণ আগ্রাসী তান্ডব। যারা একদিন ছিল এলাকার প্রভাবশালী নাম-ডাকওয়ালা মানুষ, আজ তাদের অনেকেই নিঃস্ব-রিক্ত। এসব পরিবারের অনেক ছেলে-মেয়েই বেঁচে থাকার প্রয়োজনে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় কর্মরত রয়েছে। আর তাদের আদরের সন্তানেরা দিনে পর দিন বেড়ে উঠছে তাদের আদর-স্নেহ থেকে। 


    আমিনা দৌলত জামান মানবসেবা হাসপাতালে নিজের শিশু পুত্রের চিকিৎসা নিতে আসা আয়েশা খাতুন জানান, কি করমু, জীবন বাঁচানোর জন্য ঢাকায় কাজ করি। মায়ে খবর দিছে ছলের(সন্তানের) অসুখ খুব বেশি। দুই দিনের ছুটি নিয়া আছি।  তিনি জানান, যখন সারাদিন কাম(কাজ) শ্যাষে রুমে যাই তখন ভালো লাগেনা। খাইতে বসলে চোখে পানি আসে, না জানি আমার ব্যাটা (শিশুপুত্র) কি খাইতাছে। কিন্তু সব মাইনা চলতে হয়। পেটতো চালান লাগবো। জিসানের দাদী জানান, ‘ছেলে-বউ ঢাকায় থাকে। নাতীকে আমার কাছে রেখে গেছে। তাকেতো আর ফেরতে পারিনা। তবে মাঝে মাঝে খুব কষ্ট হয়। কখনো কান্নাকাটি করে, আবার কখনো হেসেখেলে বেড়ায়।’ 


    ভাঙন-জনপদের মাইজবাড়ি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শওকত হোসেন জানান, এলাকায় এরকম অনেক শিশুই আছে যারা মায়ের কোল ছাড়াই বেড়ে উঠছে। এর কোন সঠিক পরিসংখ্যান না থাকলেও মোট পরিবারের প্রায় ২০ শতাংশ শিশু এমনি করে বেড়ে উঠছে বলে তিনি জানান।  কাজিপুর উপজেলা চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ মোজাম্মেল হক বকুল সরকার জানান, চরাঞ্চলের বেশির ভাগ ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী মায়েরা তাদের বাচ্চাদের নানী-দাদির নিকট রেখে কাজের উদ্দেশ্যে চলে যায়। এদের পরিসংখ্যানও কোন অফিসে নেই। তবে তাদের জন্যে নতুন করে ভাববার সময় এসেছে। 

     

    স্টাফ করেসপন্ডেন্ট,কাজিপুর ০৭ জানুয়ারী, ২০১৯ ০২:৩৫ অপরাহ্ন প্রকাশিত হয়েছে এবং 91 বার দেখা হয়েছে।
    পাঠকের ফেসবুক মন্তব্যঃ
    Expo
    Slide background EduTech EduTech EduTech EduTech EduTech EduTech
    Slide background SaleTech SaleTech SaleTech SaleTech SaleTech EduTech
    কাজিপুর অন্যান্য খবরসমুহ
    সর্বশেষ আপডেট
    নিউজ আর্কাইভ
    ফেসবুকে সিরাজগঞ্জ কণ্ঠঃ
    বিজ্ঞাপন
    সিরাজগঞ্জ কণ্ঠঃ ফোকাস
    • সর্বাধিক পঠিত
    • সর্বশেষ প্রকাশিত
    বিজ্ঞাপন

    ভিজিটর সংখ্যা
    8409102
    ১৭ জানুয়ারী, ২০১৯ ০৬:১৫ অপরাহ্ন