স্বাধীন বাংলা বেতারের প্রথম কণ্ঠশিল্পী শাহ আলী সরকারের আজ পঞ্চম মৃত্যুবার্ষিকী
১৯ ফেব্রুয়ারী, ২০১৯ ০৬:০৬ অপরাহ্ন


  

  • কাজিপুর/ অন্যান্য:

    স্বাধীন বাংলা বেতারের প্রথম কণ্ঠশিল্পী শাহ আলী সরকারের আজ পঞ্চম মৃত্যুবার্ষিকী
    ১৩ জানুয়ারী, ২০১৯ ০৩:৪৭ অপরাহ্ন প্রকাশিত

    আবদুল জলিলঃ কণ্ঠযোদ্ধা শাহ আলী সরকার। স্বাধীন বাংলা বেতারের প্রথম কণ্ঠশিল্পী। একই সঙ্গে কণ্ঠ এবং সন্মুখ যুদ্ধে পাক সেনাদের বিরুদ্ধে অংশ নিয়েছেন। যুদ্ধকালীন অবস্থায় দেশের পক্ষে জনমত সৃষ্টি ও অর্থ সাহায্য সংগ্রহের জন্য দেশে-বিদেশে কাজ করেছেন। লিখেছেন, সুর করেছেন আবার নিজেই পরিবেশন করেছেন একাধিক দেশাত্ববোধক ও জাগরণী গান। স্বাধীন হওয়ার লক্ষ্যেই তিনি যোগ দিয়েছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামে। অথচ যুদ্ধের পরেও অর্থনৈতিক মুক্তি আর স্বাধীনতার জন্য অবিরাম যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হয়েছে তাকে। আর সংগ্রাম শেষে না হতেই তিনি চলে গেছেন ওপারের ঠিকানায় ২০১৪ সনের আজকের দিনে। ইতিহাসের অংশ হয়ে যাওয়া শাহ আলী সরকারের প্রয়াণ দিবসে কাজিপুর মুক্তিযোদ্ধা সংসদের নেই কোন কর্মসূচি। কাজিপুরের সাবেক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার এসএম হাবিবুর রহমান জানান, ‘উনার (শাহ আলী সরকার) মেয়ে কবরের পাশে দোয়ার আয়োজন করেছে রাতে। সেখানে যাবো।’


    যার অতীত সমৃদ্ধ অসীম আর বর্তমান-ভবিষ্যৎ অন্ধকারের আস্তাবলে ঘূর্নায়মান -স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের তিনিই প্রথম কন্ঠযোদ্ধা শাহ আলী সরকার। সিরাজগঞ্জের কাজিপুর উপজেলাধীন ঢেকুরিয়া গ্রামে ১৯৪৭ সালে শাহ আলী সরকার জন্ম গ্রহন করেন। গ্রামের স্কুলে ৫ম শ্রেণীর পাঠশেষে চলে যান রংপুরে। সেখানকার কালীগঞ্জ উপজেলার কুমড়ির হাট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক ও কারমাইকেল কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক ও স্নাতক পাস করেন। যোগ দেন সঙ্গীত শিল্পী হিসেবে রংপুর বেতারে।


    ১৯৭১ এর উত্তাল মার্চ। সমগ্র পূর্ব পাকিস্তান স্বাধীনতার অগ্রিমন্ত্রে উজ্জীবিত। শাহ আলী সরকার ২৫ মার্চের পর রংপুরের ভুরুঙ্গামারী মুক্তিকাম্পে যোগ দেন। মার্চ থেকে মে মাস পর্যন্ত সেখানে প্রশিক্ষণ ও অপারেশনে অংশ গ্রহন করেন। এসময় নবগঠিত অস্থায়ী সরকার সিদ্ধান্ত নেন পাকবাহিনীর নৃশংসতার ইতিহাস বহিঃবিশ্বে তুলে ধরতে হবে। সেই সাথে মুক্তিবাহিনীর জন্য তহবিল সংগ্রহের উদ্যোগ নেন। এরই অংশ হিসেবে শাহ আলী সরকার কোলকাতায় স্বাধীন বাংলা বেতার প্রতিষ্ঠার সঙ্গে জড়িত হন। পাড়ি জমান কোলকাতা। ২৬ মে নিজের লেখা ও সুরে- তোরা কোথায় রে বাংলা ভাষী/ মুক্তিযুদ্ধে চলো যাই; এর পর, আরেও বাঙ্গালীরে/ দুশমনেরে দেশে রাইখো না’ ইত্যাদি গান পরিবেশন করেন। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের তিনিই প্রথম কন্ঠশিল্পী।


    এরপর মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে তহবিল সংগ্রহ ও বহিঃবিশ্বে মুক্তিযোদ্ধাদের কর্মকান্ড তুলে ধরতে একটি সাংস্কৃতিক দল গঠন করা হয়। সেখানে এদেশের পক্ষে অংশ নেন প্রয়াত কণ্ঠশিল্পী মোশাদ আলী ও শাহ আলী সরকার। ভারতীয়দের মধ্যে ছিলেন রমাগুহ ঠাকুরতা, নির্মলেন্দু চৌধুরী, সবিতাব্রত দত্ত, রাধাকান্ত, ফনী ভূষণ ভট্রাচার্য ও চন্দ্রকান্ত নন্দী। এই সঙ্গীত দল ৭ নভেম্বর থেকে ৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত বহিঃবিশ্বের নানাস্থানে সঙ্গীত পরিবেশন করেন। তাদের সাথে বহু বিদেশি শিল্পীও মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে সঙ্গীত পরিবেশন করেন।


     ১৪ নভেম্বর লন্ডনের রোজ বেরী এভিনিউ, ইসি ওয়ান, এ এক কনসার্ট অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে শাহ আলী সরকার সম্পর্কে পরিচিতি পত্রে উলে¬খ করা হয়- Shah Ali Sarkar is popularly known as ‘palli kobi’ (peoples poet and singer) in East pakistan and specializes in the rural vocal music and folk singing......Shah Ali Sarkar is popularly known as ‘palli kobi’ (peoples poet and singer) in East pakistan and specializes in the rural vocal music and folk singing......


    ২৭ নভেম্বর ইন্ডিয়ান হাই কমিশনের উদ্যোগে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে বিবিসিতে বাইশটি দেশের সরকার প্রধানদের উপস্থিতিতে স্বাধীন বাংলার পক্ষে স্বাক্ষাতকার দেন শাহ আলী সরকার। দেশ স্বাধীন হবার পর শাহ আলী সরকার রংপুরে বেতার থেকে ঢাকা বেতারে চলে আসেন। এরপর থেকে শুরু হয় শাহ আলী সরকারের ভাগ্য বিড়ম্বিত জীবনের সামনে এগিয়ে চলা। স্বাধীন বাংলা বেতারের সঙ্গে অসহযোগিতার কারনে বেশ কিছু নামিদামি শিল্পীকে ঢাকা বেতার থেকে বরখাস্ত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়। শাহ আলী সরকার মানবিক কারণে এ বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করলে তৎকালীন বেতারের কর্ণধার শামসুল হুদা চৌধুরীর সঙ্গে তার দূরত্বের সৃষ্টি হয়। এক পর্যায়ে শাহ আলী সরকারকেই বেতার থেকে বহিস্কার করা হয়। রাগে-ক্ষোভে-অভিমানে তিনি ঢাকা ত্যাগ করে ফিরে আসেন রংপুরে। কিন্তু সেখানেও তাকে সুযোগ দেয়া হয়নি। 


    ভাগ্য বিড়ম্বিত জীবনের শুরু এভাবেই হলো। বেকার টগবগে শাহ আলী সরকার এসময় দেশের বিভিন্ন মাজার, দরবার, সন্ন্যাসীর আখড়া, তরিকার জলসা প্রভৃতি স্থানে ঘুরে বেড়াতে থাকেন। এক পর্যায়ে সংসারের সঙ্গে তার সব সম্পর্ক চুকে যায়। এসময় তারই সহ শিল্পীরা বিভিন্ন স্বাক্ষাৎকারে, কলামে, বক্তৃতায়, অনুষ্ঠানে বলতে থাকেন, স্বাধীনতার পরই মস্তিস্ক বিকৃত হয়ে শাহ আলী সরকার মারা গেছেন। মৃত্যুর চাঁদরে ঢেকে ফেলার এমন প্রয়াসে বিস্মিত হন তিনি। কিন্তু নিভৃতচারী, বিনয়ী এই কন্ঠযোদ্ধা একবারের জন্যেও প্রতিবাদ করেননি। অর্র্থ, পদ, লোভ, মোহ কোন কিছুই তাকে বিচলিত করতে পারেনি।  এই দুঃস্থ কন্ঠযোদ্ধার জীবনকে অক্টোপাসের মতো ঘিরে ধরে দারিদ্রতা। পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন এই ত্যাগী লোকটি দীর্ঘদিন কাজিপুরের ঢেকুরিয়া গ্রামের এক ঝুঁপড়ি ঘরে বাস করেন। মৃত্যুর কিছুদিন আগে এটিএন নিউজ. চ্যানেল একাত্তর তাকে নিয়ে অনুষ্ঠান প্রচার করে। বিটিভি'তেও তার সাক্ষাৎকার প্রচারিত হয়েছে।


     আমৃতু্যু সামাজিক-সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে অংশ নিয়ে তিনি দেশপ্রেম, বিভিন্ন বিষয়ে সচেতনতার কথা তুলে ধরতেন। তিনি ধর্মীয় গোড়ামি ও সাম্প্রদায়িকতার উর্ধে থেকে মানুষকে অসাম্প্রদায়িক জীবন গড়ার আহ্বান জানিয়েছেন। দেশের বিভিন্ন স্থানে আজও তার অনেক অনুসারী রয়েছে। কাজিপুর উপজেলার নিভৃত পল্লী, তরিকার জলসা, যমুনার চরাঞ্চলে কৃষাণ-কৃষাণির মাঝে দিনে বা রাতে আজও যেন শাহ আলী সরকারের কন্ঠে ভেসে আসে তোরা কোথায়গো বাংলাভাষী......। 

     

    স্টাফ করেসপন্ডেন্ট,কাজিপুর ১৩ জানুয়ারী, ২০১৯ ০৩:৪৭ অপরাহ্ন প্রকাশিত হয়েছে এবং 159 বার দেখা হয়েছে।
    পাঠকের ফেসবুক মন্তব্যঃ
    Expo
    Slide background EduTech EduTech EduTech EduTech EduTech EduTech
    Slide background SaleTech SaleTech SaleTech SaleTech SaleTech EduTech
    কাজিপুর অন্যান্য খবরসমুহ
    সর্বশেষ আপডেট
    নিউজ আর্কাইভ
    ফেসবুকে সিরাজগঞ্জ কণ্ঠঃ
    বিজ্ঞাপন
    সিরাজগঞ্জ কণ্ঠঃ ফোকাস
    • সর্বাধিক পঠিত
    • সর্বশেষ প্রকাশিত
    বিজ্ঞাপন

    ভিজিটর সংখ্যা
    8851272
    ১৯ ফেব্রুয়ারী, ২০১৯ ০৬:০৬ অপরাহ্ন