একজন বহুমাত্রিক রবীন্দ্রনাথ
১৯ ফেব্রুয়ারী, ২০১৯ ০৬:০৩ অপরাহ্ন


  

  • কাজিপুর/ সাহিত্য সংস্কৃতি:

    একজন বহুমাত্রিক রবীন্দ্রনাথ
    ১৫ জানুয়ারী, ২০১৯ ০৫:৩৪ অপরাহ্ন প্রকাশিত

    আবদুল জলিলঃ সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিক, রবীন্দ্রনাথ-যার জন্ম তিথিতে লক্ষ্মী আর সরস্বতীর ছিল সহাবস্থান। দুজনেই বাধা পড়েছিলেন কোলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারে। সময়টা ছিল ১৮৬১ সনের ৭ মে,বাংলা ১২৬৮ সনের ২৫ বৈশাখ। তাঁর পিতা মহর্ষী দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর আর মাতা সারদা দেবী ঠাকুর। একদিকে ছিল বিত্ত-বৈভব অন্যদিকে পরিবারে ছিল বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের উপযোগি পরিবেশ, আর সত্যেন্দ্রনাথ, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো মণীষীবৃন্দ। যারা সাহিত্য-শিল্পকলা থেকে শুরু করে সর্ববিষয়ে সর্বজনবিদিত। তাঁদের দেখানো পথে উত্তরসাধক হয়ে এ ধরাধামে আবির্ভূত হলেন বিশ্বনন্দিত কবি রবীন্দ্রনাথ।

    কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ তামাম বিশ্বের এক বিস্ময়পুরুষ। মানব জীবনে এমন কোন চিন্তা-চেতনা নেই এমন কোন ভাব-কল্পনা নেই, যেখানে তাঁর তুলির আঁচড় পড়েনি। মানুষের নিরন্তর ছুটে চলার পথের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনার বাণী তাঁর লেখায় মূর্ত হয়ে উঠেছে। এর শুরুটা শৈশব থেকেই। বড়কর্তা ব্রজেন্দ্রনাথ আর ছোটকর্তা শ্যামের তত্বাবধানে অনেকগুলো ভাই-বোনের সাথে অত্যন্ত কঠোর শৃংখলার মধ্য দিয়ে তাঁকে শৈশব কেটেছে।
     বাড়িতেই তাঁর পাঠ্য জীবনের সূচনা। পরে অবশ্য নর্মাল স্কুল ও ওরিয়েন্টাল সেমিনারিতে কিছুদিন যাতায়াত। কিন্তু যার মন আকাশের মতো উদার সমুদ্রের মতো বিশাল সেকি চার দেয়ালের মাঝে বেধে দেয়া সিলেবাসের পাঠ গিলে শান্ত থাকবে? না তিনি শান্ত থাকেন নি। বাড়িতেই গৃহ শিক্ষকের নিকট ঘন্টার পর ঘন্টা নানামাত্রিক পড়ালেখায় জীবনকে সাজিয়ে নেবার রসদ সংগ্রহ করেছেন।

           ‘জল পড়ে পাতা নড়ে।’ বালক রবীন্দ্রনাথের মনের প্রথম ছন্দের হাত ধরে এগিয়ে চলা। এই ছন্দই তাঁর হৃদয় বীণার তারে তুলেছিল ঝংকার। জীবন স্মৃতিতে তিনি লিখলেন, ’আমার জীবনের এইটেই আদি কবির প্রথম কবিতা।...এমনি করিয়া ফিরিয়া ফিরিয়া সেদিন আমার সমস্ত চৈতন্যের মধ্যে জল পড়িতে ও পাতা নড়িতে লাগিল।’ শুরু হলো বিশ্ব কবির বিশ্বযাত্রা। এ যাত্রার গতি-প্রকৃতি এমনি ধারালো ছিল যে যুবক রবীন্দ্রনাথের লন্ডনের ব্যারিস্টারি পড়া শেষ হতে দিল না। ফিরে এলেন, নিয়ে এলেন পাশ্চাত্যের নানা বিষয়ের অভিজ্ঞতা যা পরবর্তিকালে তাঁর প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের সেতুবন্ধ রচনায় সহায়ক হয়েছিল।

    রবীন্দ্রনাথের কাব্য- কবিতা গান, নাটক, ছোটগল্প, প্রবন্ধ, নিবন্ধ সবকিছুতেই খুঁজে পাওয়া যায় এক গভীর জীবনবোধ। তাঁর কাব্যে ব্যথাহত খুঁজে পাবেন ব্যথা বিজয়ের প্রেরণা, দার্শনিক পাবেন প্রকৃত সত্যের সন্ধান, রাজনীতিবিদ পাবেন নির্ভুল দিক নির্দেশনা ,মৃত্যুপথযাত্রি পাবেন মৃত্যুঞ্জয়ী সান্ত¦না। মাত্র তের বছর বয়সে তাঁর রচিত প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয় তত্ববোধিনী পত্রিকায়। এরপর বিলেত থেকে ঘুরে আসার পর জ্যোতিরিন্দ্রনাথের প্রেরণায় তাাঁর কাব্য কবিতায় এলো এমন জোয়ার যার প্রবাহে সমস্ত বাংলা সাহিত্য এক গভীর ঝাঁকুনি খেয়ে নতুনরূপে, নতুন প্রাণ ফিরে পেল। রচিত হলো তাঁর প্রথম গীতিনাট্য বাল্মীকি প্রতিভা।
     যৌবনের প্রথম প্রভাতে তাঁর কাব্যের  উৎসমুখ খুলে গিয়েছিল ,তার মর্মরিত কলতানে ঝংকৃত হয়ে উঠলো একের পর এক সন্ধ্যা সঙ্গীত, প্রভাত-সঙ্গীত, ছবি ও গান, কড়ি ও কোমল, ভানুসিংহের পদাবলি, মানসী ও সোনার তরী। 
    এবার সোনার তরীর যাত্রাপথে একে একে চিত্রা, চৈতালি, কণিকা , কল্পনা,কথা ও কাহিনী, নৈবেদ্য, খেয়া’র পরে গীতাঞ্জলির গানগুলি সব সোনার ফসল হয়ে উঠলো সোনার তরীতে। তারপর যথারীতি সোনার তরীর সুদূরের পানে যাত্রা - হেথা নয় হেথা নয়  অন্য কোথা অন্য কোনখানে। 
    এরপর বলাকা, পলাতকা, পূরবী, বনবাণী, মহুয়া, পরিশেষ, পুনশ্চ, শেষ সপ্তক, পত্রপূট ও শ্যামলীর ধারা বেয়ে তাঁর কাব্যতরী নবজাতক, সানাই, জন্মদিনে ও শেষ লেখার মধ্য দিয়ে উধাও হয়ে গেছে। 
    এতো গেল কাব্যের কথা। নাটক, প্রবন্ধ, রসরচনা, সমালোচনা, উপন্যাস, ছোটগল্প, গান, শিশু-সাহিত্য, বিজ্ঞান, ভ্রমণকাহিনী-সব বিভাগেই তাঁর স্বচ্ছšদ বিচরনের যোগফল বর্তমান বাংলা সাহিত্যের এমন উন্নতি। 
    রবীন্দ্রনাথের গানের প্রাচুর্য হিমালয়ের মতো বিশাল। তাঁর গানের বিশেষত্ব ও বৈচিত্র্য সর্বজনবিদিত । তাকে বলা হয় গানের রাজা-সেটাতো আর এমনি নয়। আশৈশব সঙ্গীতে অসামান্য পারদর্শি রবীন্দ্রনাথ নিজে সুকণ্ঠ গায়ক, নিজেই সুরারোপ করে রবীন্দ্র সঙ্গীতের একটি অনবদ্য ধারা সৃষ্টি করেছেন। কথা সুর আর রাগের নানামাত্রিক সম্মিলন বাংলা সাহিত্যে সত্যি বিরল। যতদিন পৃথিবীতে প্রেম-প্রকৃতি, ঈশ্বর ভাবনা, দেশপ্রেম আর স্বপ্ন-কল্পনা থাকবে ততদিন রবীন্দ্র সঙ্গীতের মৃত্যু নেই। তাঁর সঙ্গীত যে দু’দুটি দেশের চেতনার প্রতীক জাতীয় সঙ্গীত, নিখিল মানবের তৃষিত চিত্তের তৃপ্তি সরোবর।

    নাট্য সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ অসাধারণ এক ব্যক্তিত্ব। তাঁর রচিত নাটকগুলি গীতিপ্রধান ও কাব্যধর্মী। তাছাড়া হাস্যরসাতœক নাটকও তিনি রচনা করেছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য নাটকগুলি হলো রক্তকরবী, রাজা, ডাকঘর, বৈকুণ্ঠের খাতা, চিরকুমার সভা, বিসর্জন ইত্যাদি। 
    নাটক রচনার পাশাপাশি তিনি একজন দক্ষ অভিনেতা। অনেক নাটকে তিনি নিজে অভিনয় করেছেন। ঠাকুর বাড়িতেই অনেক নাটক ঐ সময় মঞ্চস্থ হয়েছে।  
    আত্মজীবনী রচনাগুলোও বেশ সরেস। ছেলেবেলা, জীবনস্মৃতি বাংলা সাহিত্যে এক বিশেষ স্থান দখল করে আছে। এর সঙ্গে চিঠিপত্র বিষয়ক গ্রন্থ ছিন্নপত্রাবলী বিখ্যাত।
      বাঙালির আশাÑআকাক্সক্ষা, হাসি-কান্না, পাওয়া না পাওয়ার বেদনার অপূর্ব প্রকাশ ঘটেছে তাঁর বহু ছোটগল্পে। কঙ্কাল, ক্ষুধিত পাষাণ, পোস্ট মাস্টার, বলাই, অতিথি, অপূর্ব ক্ষমা, একরাত্রি প্রভৃতি ছোটগল্প শুধু বাংলা সাহিত্যে নয়, বিশ্ব সাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ। ছোট গল্পের রাজা ছিলেন তিনি। নানাজনের নানা সংজ্ঞার বেড়াজালকে ডিঙিয়ে তিনি যে ছোট গল্পের সংজ্ঞা দাঁড় করিয়েছেন তা শুধু বাংলা সাহিত্যে নয়, বিশ্ব সাহিত্যে সমধিক সমাদৃত।

    রবীন্দ্রনাথের স্বদেশ ও সমাজ ভাবনা অত্যন্ত পরিশীলিত। কালান্তরে তিনি রাজনীতি, দেশ ও  সমাজের নতুন রূপরেখা টেনেছেন। দেখেছেন নতুন এক সমাজ-সামাজিক আবহ, যেখানে মানুষের মুক্ত চিন্তার প্রকাশ ঘটিয়ে রাষ্ট্রকে সাজিয়েছেন ভিন্ন মাত্রায়। স্বাধীনতা আন্দোলনে তিনি সক্রিয় অংশগ্রহণ না করলেও তাঁর কাব্য-কবিতা, গান, প্রবন্ধ সবকিছুর মাধ্যমে তিনি আন্দোলনকে বেগবান করেছেন। জালিনওয়ালাবাগের হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে নাইট উপাধি প্রত্যাখ্যান করে তিনি গভীর দেশাত্ববোধের পরিচয় দিয়েছেন।
       
    বহুদেশ ঘুরেছেন কবিগুরু। কিন্তু শুধু ভ্রমণের জন্যই তিনি ভ্রমণ করেননি। যেখানেই গেছেন সেখানেই তিনি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বার্তা পৌঁছে দিয়েছেন। একজন দক্ষ রাজনীতিকের মতো বাংলা সাহিত্যের পক্ষে কাজ করেছেন তিনি। তাঁর ভ্রমণ বিষয়ক রচনা জাপানের ডায়েরী বাংলা সাহিত্যে অনবদ্য। 
    একজন দক্ষ সংগঠক হিসেবে রবীন্দ্রনাথ প্রথম সারির মানুষ। বীরভূম জেলার বেলপুরে তিনি শান্তি নিকেতন নামে একটি শিক্ষাকেন্দ্র স্থাপন করে নিজে শিক্ষক হয়ে পাঠদান করেছেন । এরপর সেখানেই বিশ্বভারতী প্রতিষ্ঠা তাঁরই কৃতিত্বের সাক্ষর বহন করে চলেছে।
    সীমার মাঝে অসীমের সন্ধানকারী রবীন্দ্রনাথ পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে উন্নত সাহিত্য সম্ভার পিছনে ফেলে ১৯৪১ সালের ৭ আগস্ট  পরপারে চলে গেছেন। তিনি চলে গেলেও বাংলা সাহিত্যাকাশে রবিরশ্মি সর্বদাই দীপ্যমান। তিনি লিখেছেন-
              ‘আজি হতে শতবর্ষ পরে 
          কে তুমি পড়িছ বসি আমার কবিতাখানি
             কৌতুহল ভরে
              আজি হতে শতবর্ষ পরে।’
    কাল নিরবধি। একদিন সবাইকে চলে যেতে হবে। এটাই নিয়তি। কিন্তু তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কবিগুরুর চিরচলিষ্ণু গতি যেন অপ্রতিরোধ্য। তাই বলা চলে শতবর্ষ কেন, লক্ষ-কোটি বছর পরেও রবীন্দ্রনাথ আমাদের মাঝে থাকবেন। যতদিন বাঙালি জাতি, বাংলা সাহিত্য, বাংলা ভাষা থাকবে ততদিন রবীন্দ্রনাথ থাকবেন প্রতিটি মানুষের মনের মণিকোঠায়। 

    স্টাফ করেসপন্ডেন্ট,কাজিপুর ১৫ জানুয়ারী, ২০১৯ ০৫:৩৪ অপরাহ্ন প্রকাশিত হয়েছে এবং 110 বার দেখা হয়েছে।
    পাঠকের ফেসবুক মন্তব্যঃ
    Expo
    Slide background EduTech EduTech EduTech EduTech EduTech EduTech
    Slide background SaleTech SaleTech SaleTech SaleTech SaleTech EduTech
    কাজিপুর অন্যান্য খবরসমুহ
    সর্বশেষ আপডেট
    নিউজ আর্কাইভ
    ফেসবুকে সিরাজগঞ্জ কণ্ঠঃ
    বিজ্ঞাপন
    সিরাজগঞ্জ কণ্ঠঃ ফোকাস
    • সর্বাধিক পঠিত
    • সর্বশেষ প্রকাশিত
    বিজ্ঞাপন

    ভিজিটর সংখ্যা
    8851229
    ১৯ ফেব্রুয়ারী, ২০১৯ ০৬:০৩ অপরাহ্ন